ফুটবলের মহোৎসব বিশ্বকাপ ফাইনালের মহারণকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে। মাঠের লড়াই শুরুর আগেই এই উন্মাদনা ছুঁয়ে গেছে বৈশ্বিক কূটনীতির অঙ্গনকেও। লাতিন আমেরিকার পরাশক্তি আর্জেন্টিনার প্রতি এবার প্রকাশ্য সমর্থন ব্যক্ত করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। আর্জেন্টিনার বর্তমান প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইর সঙ্গে তাঁর গভীর বন্ধুত্বের সূত্র ধরেই এই সমর্থনের কথা জানান তিনি। নেতানিয়াহুর বিশ্বাস, কেবল তিনি একাই নন, বরং ইসরায়েলের সিংহভাগ নাগরিকই এই হাইভোল্টেজ ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিজয় দেখতে মুখিয়ে আছেন।
আজ নিউইয়র্ক-নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেনের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। শিরোপা নির্ধারণী এই মেগা ম্যাচের আগের দিন জেরুজালেমে ইসরায়েলে নিযুক্ত আর্জেন্টিনার নবনিযুক্ত রাষ্ট্রদূত রাব্বি শিমন অ্যাক্সেল ওয়াহনিশের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মিলিত হন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নানা বিষয়ের পাশাপাশি এই বৈঠকের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল ফুটবল ও বিশ্বকাপ ফাইনালের আবহ।
“হাভিয়ের, তুমি একজন মহান বন্ধু। সত্যিকারের বন্ধু। আমরা সব সময় তোমার পাশে আছি। নানা ক্ষেত্রে আমরা আর্জেন্টিনাকে সমর্থন দিয়ে আসছি এবং আগামীকালও এর ব্যতিক্রম হবে না। তোমাদের জন্য শুভকামনা।” — বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী (প্রেসিডেন্ট মিলেইর উদ্দেশ্যে)
উপহারের জার্সি ও প্রেসিডেন্ট মিলেইর অডিও বার্তা
সৌহার্দ্যপূর্ণ এই বৈঠকের সময় রাষ্ট্রদূত রাব্বি শিমন অ্যাক্সেল ওয়াহনিশ ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর হাতে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের একটি ঐতিহ্যবাহী জার্সি উপহার হিসেবে তুলে দেন। জার্সিটি গ্রহণের সময় নেতানিয়াহু উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে রাষ্ট্রদূত আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইর পক্ষ থেকে পাঠানো একটি বিশেষ অডিও বার্তা নেতানিয়াহুকে শোনান।
উক্ত অডিও বার্তায় আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট মিলেই অত্যন্ত আবেগঘন ভাষায় বলেন, “আপনি আমার অত্যন্ত প্রিয় বন্ধু, যিনি সব সময় আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং সমর্থন করে গেছেন। আমি জেনে অত্যন্ত আনন্দিত ও আপ্লুত হয়েছি যে, আপনি ব্যক্তিগতভাবে আমার কারণে ও আমাদের বন্ধুত্বের খাতিরে ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করছেন।”
‘ভামোস আর্জেন্টিনা’ ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ
প্রেসিডেন্ট মিলেইর এই বার্তার জবাবে নেতানিয়াহু তাঁর চিরচেনা রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অবস্থানের বাইরে গিয়ে একজন খাঁটি ফুটবল ভক্তের মতো প্রতিক্রিয়া জানান। রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আলাপকালে নিজের ফুটবলীয় পছন্দের বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে তিনি বলেন, “আমি এই বিষয়টি মোটেও লুকিয়ে রাখতে চাই না যে আমি আর্জেন্টিনার সমর্থক। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, ইসরায়েলের বেশির ভাগ সাধারণ নাগরিকও এবার ফাইনালে আর্জেন্টিনার পক্ষেই গলা ফাটাবেন। শুভকামনা! ভামোস আর্জেন্টিনা।”
বিশ্লেষকদের মতে, ফুটবলকে কেন্দ্র করে এই প্রকাশ্য সমর্থন আসলে আর্জেন্টিনা ও ইসরায়েলের বর্তমান দুই শীর্ষ নেতার মধ্যকার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ও আদর্শিক সম্পর্কেরই বহিঃপ্রকাশ। কট্টর ডানপন্থী অর্থনীতিবিদ হাভিয়ের মিলেই আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর থেকেই ইসরায়েলের প্রতি তাঁর অকুণ্ঠ ও প্রকাশ্য সমর্থন ব্যক্ত করে আসছেন। এমনকি আর্জেন্টিনার দূতাবাস তেল আবিব থেকে জেরুজালেমে স্থানান্তরের ঐতিহাসিক ঘোষণাও দিয়েছেন মিলেই, যা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ককে এক অভূতপূর্ব উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
শিরোপার লড়াই ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
চলতি বিশ্বকাপে ফুটবল জাদুকর লিওনেল মেসির নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা দল মাঠে নামছে টানা দ্বিতীয়বারের মতো এবং নিজেদের ফুটবল ইতিহাসের চতুর্থ বিশ্বকাপ শিরোপা ঘরে তোলার লক্ষ্য নিয়ে। কাতার বিশ্বকাপের অবিশ্বাস্য সাফল্যের পর এই ট্রফিটি ধরে রাখা আলবিসেলেস্তেদের জন্য এক বিশাল মর্যাদার লড়াই।
অন্যদিকে, লা রোহা খ্যাত ইউরোপীয় পরাশক্তি স্পেনও ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়। ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে প্রথমবার বিশ্বজয়ের স্বাদ পাওয়ার পর, দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে। স্প্যানিশ কোচ ও তরুণ তুর্কিদের লক্ষ্য এবার ২০১০ সালের পর দ্বিতীয়বারের মতো সোনালী ট্রফিটি নিজেদের করে নেওয়া। ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার ফুটবলের এই ক্ল্যাসিক দ্বৈরথকে ঘিরে তাই এখন বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ফুটবল প্রেমীর চোখ নিউইয়র্ক-নিউ জার্সির স্টেডিয়ামের দিকে। তবে মাঠের লড়াই শুরুর আগেই কূটনীতির মাঠে ইসরায়েলের এই প্রকাশ্য সমর্থন আর্জেন্টিনার শিবিরে বাড়তি অনুপ্রেরণা যোগাবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
