নজরের আড়ালে থাকা চৈতী দেশের জন্য আনল ঐতিহাসিক স্বর্ণপদক

একসময় যে মেয়েটিকে দেখে পরিবারে নেমে এসেছিল দুশ্চিন্তার ছায়া, আজ সেই মেয়েই দেশের ক্রীড়াঙ্গনে গৌরবের নতুন ইতিহাস লিখেছে। শারীরিক গঠনের কারণে যাকে অনেকেই সীমাবদ্ধতার চোখে দেখত, সেই চৈতী রানী দেবই প্রথমবারের মতো এশিয়ান ইয়ুথ প্যারা গেমসে বাংলাদেশের জন্য স্বর্ণপদক এনে দিয়েছে।

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভূনবীর গ্রামের কৃষক সত্য দেব ও গৃহিণী শিলু রানী দেবের কনিষ্ঠ কন্যা চৈতীর বয়স মাত্র ১৩ বছর। উচ্চতা মাত্র ৩ ফুট ৭ ইঞ্চি। ছোটবেলায় মেয়ের শারীরিক বৃদ্ধি স্বাভাবিক না হওয়ায় মা–বাবা বুঝতে পারেন, চৈতী খর্বাকৃতির (ডোয়ার্ফিজম) সমস্যায় ভুগছে। তখন ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা ছিল নিত্যসঙ্গী। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই দুশ্চিন্তা বদলে গেছে গর্বে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত এশিয়ান ইয়ুথ প্যারা গেমস ২০২৫-এ চৈতী অংশ নেয় প্যারা অ্যাথলেটিকসে। বর্শা নিক্ষেপ ও ১০০ মিটার দৌড়—এই দুই ইভেন্টেই সে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখিয়ে জিতে নেয় দুটি স্বর্ণপদক। বিশেষ করে বর্শা নিক্ষেপে পাওয়া স্বর্ণপদকটি প্যারা স্পোর্টসে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম।

ভূনবীর দশরথ হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী চৈতী একসময় গ্রামে পরিচিত ছিল শুধু তার খর্বাকৃতির জন্য। খেলাধুলায় যে তার অসাধারণ প্রতিভা রয়েছে, তা প্রথম নজরে আসে ‘স্পোর্টস ফর হোপ অ্যান্ড ইনডিপেনডেন্স (শি)’ নামের একটি সংগঠনের কাছে। সেখান থেকেই শুরু হয় তার অ্যাথলেটিকসের যাত্রা। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে নিয়মিত প্রশিক্ষণ নিতে থাকে সে।

দুবাই যাওয়ার আগে প্রায় এক মাস সাভারের বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি)-এ প্রশিক্ষণ নেয় চৈতী। সীমিত সুযোগ-সুবিধা ও সরঞ্জামের অভাব সত্ত্বেও তার অধ্যবসায় ছিল চোখে পড়ার মতো। কোচদের ভাষায়, চৈতীর সবচেয়ে বড় শক্তি তার অদম্য ইচ্ছাশক্তি।

চৈতীর সাফল্যে এখন বদলে গেছে গ্রামের চিত্র। যাদের দৃষ্টিতে একসময় করুণা ছিল, আজ তাদের চোখে গর্ব। স্কুলে সে এখন অনুপ্রেরণার নাম। শিক্ষক, সহপাঠী, গ্রামবাসী—সবাই তার সাফল্যে আনন্দিত।

চৈতীর মা শিলু রানী দেব বলেন, “কখনো ভাবিনি মেয়ে বিদেশে গিয়ে দেশের জন্য খেলবে। চাই, খেলাধুলার মাধ্যমেই ও নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলুক, কারও ওপর নির্ভরশীল না হোক।” আর চৈতীর স্বপ্ন আরও বড়—খেলাধুলা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি পড়াশোনা শেষ করে সে একজন চিকিৎসক হতে চায়।

চৈতীর গল্প প্রমাণ করে, শারীরিক উচ্চতা নয়—স্বপ্ন, পরিশ্রম আর সাহসই মানুষকে সত্যিকারের উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।


চৈতী রানী দেব: এক নজরে

বিষয়তথ্য
নামচৈতী রানী দেব
বয়স১৩ বছর
বাড়িভূনবীর গ্রাম, শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার
উচ্চতা৩ ফুট ৭ ইঞ্চি
ইভেন্টবর্শা নিক্ষেপ, ১০০ মিটার দৌড়
অর্জনএশিয়ান ইয়ুথ প্যারা গেমস ২০২৫-এ ২টি স্বর্ণপদক
বিশেষ অর্জনপ্যারা স্পোর্টসে বাংলাদেশের প্রথম স্বর্ণপদক
স্বপ্নচিকিৎসক হওয়া ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খেলা

Leave a Comment