বিশ্বকাপ ফুটবলের ডামাডোল বাজতে শুরু করেছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর বাছাইপর্বের কঠিন সমীকরণ শেষে নির্ধারিত হয়ে গেল ২০২৬ বিশ্বকাপের চূড়ান্ত অংশগ্রহণকারী দলগুলো। প্লে-অফ পর্বের নাটকীয় লড়াই শেষে শেষ ৬টি দল বিশ্বমঞ্চের টিকিট নিশ্চিত করেছে। গতকাল রাত ও আজ সকালের রুদ্ধশ্বাস সব ম্যাচে নির্ধারিত হয়েছে কার হাসি ফুটবে আর কার স্বপ্ন ভাঙবে। এই প্লে-অফের সবচেয়ে বড় ও হতাশাজনক চমক ছিল চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ইতালির বিদায়। টানা তৃতীয়বারের মতো ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই আসরে দর্শক হয়েই থাকতে হচ্ছে আজ্জুরিদের।
প্লে-অফ ফাইনালে যেমন বিষাদ ছিল, তেমনি ছিল রূপকথার মতো প্রত্যাবর্তনের গল্প। ৫২ বছর পর বিশ্বমঞ্চে জায়গা করে নিয়েছে ডিআর কঙ্গো। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরাক দীর্ঘ ৪০ বছরের খরা কাটিয়ে আবারও ফুটবল বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে। তবে এই আনন্দের মাঝে ম্লান হয়ে গেছেন রবার্ট লেভানডফস্কি এবং জিয়ানলুইজি দোন্নারুম্মার মতো বিশ্বসেরা তারকারা। নিজ নিজ দলের পরাজয়ে তারা এখন বিশ্বকাপের দর্শক সারিতে।
প্লে-অফ থেকে উত্তীর্ণ দল ও তাদের গ্রুপ বিশ্লেষণ
চেক প্রজাতন্ত্র (গ্রুপ এ):
প্লে-অফ ফাইনালে ডেনমার্কের বিপক্ষে এক স্নায়ুক্ষয়ী লড়াইয়ে জয় পেয়েছে চেক প্রজাতন্ত্র। নির্ধারিত সময়ে ১–১ এবং অতিরিক্ত সময় শেষে ২–২ সমতা থাকায় ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। সেখানে ৩–১ ব্যবধানে ডেনিশদের হারিয়ে ‘এ’ গ্রুপে জায়গা করে নেয় তারা। এই গ্রুপে তাদের মোকাবিলা করতে হবে আয়োজক মেক্সিকো, দক্ষিণ আফ্রিকা ও দক্ষিণ কোরিয়াকে।
বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা (গ্রুপ বি):
এবারের প্লে-অফের সবচেয়ে বড় ‘জায়ান্ট কিলার’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বসনিয়া। ইতালির মতো শক্তিশালী দলকে টাইব্রেকারে ৪–১ গোলে বিধ্বস্ত করে তারা বিশ্বমঞ্চে নাম লিখিয়েছে। ম্যাচের শুরুতে ইতালি লিড নিলেও ৪১ মিনিটে আলেসান্দ্রো বাস্তোনি লাল কার্ড পাওয়ায় ম্যাচ থেকে ছিটকে যায় তারা। সেই সুযোগে ৭৯ মিনিটে সমতা ফেরায় বসনিয়া। টাইব্রেকারে বাজিমাত করে তারা এখন গ্রুপ ‘বি’-তে কানাডা, কাতার ও সুইজারল্যান্ডের সঙ্গী।
তুরস্ক (গ্রুপ ডি):
২০০২ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালিস্ট তুরস্ক দীর্ঘ ২৪ বছর পর আবারও বিশ্বমঞ্চে ফিরছে। কসোভোর বিপক্ষে ১–০ গোলের ঘামঝরানো জয়ে ভাগ্য খুলেছে তাদের। ৫৩ মিনিটে কেরেম আকতারকোগ্লুর জয়সূচক গোলটি তুরস্ককে পৌঁছে দেয় গ্রুপ ‘ডি’-তে। যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে থাকছে শক্তিশালী যুক্তরাষ্ট্র, প্যারাগুয়ে ও অস্ট্রেলিয়া।
সুইডেন (গ্রুপ এফ):
পোল্যান্ডের বিপক্ষে গোলবন্যার ম্যাচে ৩–২ ব্যবধানে জয় পেয়েছে সুইডেন। স্টকহোমের স্ট্রবেরি অ্যারেনায় ম্যাচের ৮৮ মিনিটে ভিক্টর ইয়োকেরেসের জয়সূচক গোলটি গ্যালারিতে উন্মাদনা ছড়িয়ে দেয়। গ্রুপ ‘এফ’-এ সুইডেন লড়বে নেদারল্যান্ডস, জাপান ও তিউনিসিয়ার বিপক্ষে।
ইরাক (গ্রুপ আই):
১৯৮৬ সালের পর দীর্ঘ ৪০ বছর অপেক্ষার অবসান ঘটিয়েছে ইরাক। আন্তমহাদেশীয় প্লে-অফ ফাইনালে বলিভিয়াকে ২–১ গোলে হারিয়ে ইতিহাস গড়েছে তারা। তবে মূল পর্বে তাদের কঠিন পরীক্ষা দিতে হবে। গ্রুপ ‘আই’-তে তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে আছে সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স, সেনেগাল ও নরওয়ে।
ডিআর কঙ্গো (গ্রুপ কে):
অপেক্ষাটা ছিল ৫২ বছরের। জ্যামাইকাকে অতিরিক্ত সময়ের গোলে ১–০ ব্যবধানে হারিয়ে সেই অপেক্ষার সমাপ্তি টেনেছে ডিআর কঙ্গো। গ্রুপ ‘কে’-তে তারা লড়বে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পর্তুগাল, উজবেকিস্তান ও কলম্বিয়ার বিপক্ষে।
প্লে-অফ থেকে উত্তীর্ণ দলগুলোর অবস্থান ও গ্রুপ বিন্যাস
| দেশের নাম | প্রতিপক্ষ দল (প্লে-অফ ফাইনাল) | বিশ্বকাপের গ্রুপ | গ্রুপের অন্যান্য প্রতিপক্ষ |
| চেক প্রজাতন্ত্র | ডেনমার্ক | গ্রুপ ‘এ’ | মেক্সিকো, দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ কোরিয়া |
| বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা | ইতালি | গ্রুপ ‘বি’ | কানাডা, কাতার, সুইজারল্যান্ড |
| তুরস্ক | কসোভো | গ্রুপ ‘ডি’ | যুক্তরাষ্ট্র, প্যারাগুয়ে, অস্ট্রেলিয়া |
| সুইডেন | পোল্যান্ড | গ্রুপ ‘এফ’ | নেদারল্যান্ডস, জাপান, তিউনিসিয়া |
| ইরাক | বলিভিয়া | গ্রুপ ‘আই’ | ফ্রান্স, সেনেগাল, নরওয়ে |
| ডিআর কঙ্গো | জ্যামাইকা | গ্রুপ ‘কে’ | পর্তুগাল, উজবেকিস্তান, কলম্বিয়া |
২০২৬ বিশ্বকাপের নতুন ফরম্যাট
২০২৬ সালের বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে ইতিহাসের বৃহত্তম ফুটবল উৎসব। এবারই প্রথমবারের মতো ৩২ দলের পরিবর্তে ৪৮টি দল অংশগ্রহণ করবে। মেক্সিকো, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের ১৬টি ভেন্যুতে আয়োজিত এই টুর্নামেন্টে মোট ম্যাচের সংখ্যা হবে ১০৪টি।
টুর্নামেন্টের পর্দা উঠবে ১১ জুন ২০২৬ তারিখে মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক এস্তাদিও আজতেকায়, যেখানে উদ্বোধনী ম্যাচে স্বাগতিক মেক্সিকোর মুখোমুখি হবে দক্ষিণ আফ্রিকা। আর ফুটবল বিশ্বের শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট কার মাথায় উঠবে, তা নির্ধারিত হবে ১৯ জুলাই নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিতব্য মহাফাইনালের মাধ্যমে। নতুন দল, বর্ধিত কলেবর আর অভাবনীয় উন্মাদনা নিয়ে এবারের বিশ্বকাপ ফুটবলের সংজ্ঞাই বদলে দিতে প্রস্তুত।
