বাস্তিয়ান শোয়েন্সটাইগার, এক জার্মান কিংবদন্তী ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার। জার্মানির হয়ে এক বর্ণাঢ্য ফুটবলীয় ক্যারিয়ার পার করেছেন বাস্তিয়ান শোয়েন্সটাইগার।জার্মানির ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম সেরা মধ্যমাঠের ফুটবলার বাস্তিয়ান শোয়েনস্টাইগার | বাস্তিয়ান শোয়েনস্টাইগার পয়লা আগস্ট, ১৯৮৪ সালে কোলবারপুর পশ্চিম জার্মানিতে জন্মগ্রহণ করেন |
তিন বছর বয়সে প্রথমবার ফুটবলে কিক নেয়া বাস্তিয়ান শোয়েন্সটাইগার ১৪ বছর বয়সে ইয়ুথ প্রোগ্রামের মাধ্যমে বায়ার্ন মিউনিখ শিবিরে যোগ দেন। ওই ক্লাবেই ২০০২ সালে, ১৮ বছর বয়সে ফুটবল ক্যারিয়ারের প্রথম চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন তিনি। তার কর্মজীবনের শুরুতে তিনি সারা মাঝমাঠ জুড়ে খেলতেন। বাস্তিয়ান শোয়েনস্টেইগার তার জাতীয় জীবনে অনেক খ্যাতি অর্জন করেছেন |
২০০২ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত বায়ার্ন মিউনিখের মূল দলে মোট ৫০০টি ম্যাচ খেলেছেন। সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার হলেও, গোলের সাথে নিয়মিত সখ্য ছিল তার। তাই তো বায়ার্নের জার্সিতে গোলের সংখ্যা ৬৮। চলছে উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনাল। বায়ার্ন মিউনিখ, খেলছে নিজেদের মাঠে, অনিন্দ্য নির্মাণশৈলীর জন্য বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ স্টেডিয়ামগুলোর অন্যতম হয়ে উঠেছে যে স্টেডিয়াম – সেই এলিয়াঞ্জ এরেনায়।
নিজেদের মাঠে চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনাল খেলার সৌভাগ্য সবার হয় না। বায়ার্নের হয়েছিল। প্রতিপক্ষ চেলসি। ২০০১ সালের পর প্রথমবারের মত শিরোপা জয়ের হাতছানি বায়ার্নের সামনে। ১২০ মিনিটের লড়াই শেষেও ফলাফল ১-১ এ অমীমাংসীত। অবধারিতভাবেই খেলা গড়ায় পেনাল্টি শ্যুটি আউটে। পঞ্চমবারের বার পেনাল্টি নিতে এলেন বায়ার্নের সবথেকে স্থিতধী খেলোয়াড়, বাস্তিয়ান শোয়ান্সটাইগার। কিন্তু তার স্পট কিক বারপোস্টে লাগলে বায়ার্নের শিরোপাস্বপ্ন সেখানেই শেষ হয়ে যায়।
দিদিয়ের দ্রগবা শোয়ান্সটাইগারের মত ভুল করেন নি, তাই চেলসি পেয়ে যায় নিজেদের প্রথম চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের স্বাদ। বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে জিতেছেন আটটি বুন্দেসলিগা, সাতটি জার্মান কাপ, একটি লিগ কাপ। তবে একটি শিরোপা বহুদিন ধরে অধরা রয়ে যাচ্ছিল তার। সেটি হলো চ্যাম্পিয়নস লিগ। কিন্তু ২০১৩ সালে সেটিও জেতেন তিনি, এবং ওই বছর ঐতিহাসিক ট্রেবল জয় করে জার্মানির ইতিহাসের সফলতম ক্লাবটি। ডর্টমুন্ডের সাথে প্রথম থেকেই বল দখলের লড়াইয়ে এগিয়ে ছিলো বায়ার্ন।
ম্যাচের প্রথম গোলটি করেন মানজুকিচ, ৬০ মিনিটের মাথায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই গুণ্ডোগান পেনাল্টি থেকে গোল করে ডর্টমুন্ডকে সমতায় ফেরান। খেলা প্রায় শেষ, ম্যাচ তখনো ১-১। আবার ফাইনাল, আবার সেই নাটকীয়তা। তবে এবারের বায়ার্নের খেলায় অন্যান্যবারের মত সেই ইতস্ততভাবটা আর নেই। আত্মবিশ্বাসে টইটুম্বুর দল। একেবারে শেষের দিকে, ৮৯ মিনিটের মাথায় ভোজবাজির মত গোল করেন আরিয়েন রোবেন। বায়ার্ন অবশেষে জেতে তাদের বহুল আকাঙ্ক্ষিত ট্রেবল।
নিমিষে মুছে যায় আগের ফাইনালের তিক্ত অভিজ্ঞতা। বাস্তিয়ান শোয়াইন্সটাইগারের নামের পাশ থেকে মুছে যায় ‘আনলাকি’ তকমাটি। সেদিন তিনি মনে হয় পৃথিবীতে বসেই স্বর্গসুখের সন্ধান পেয়েছিলেন।এরপরেও ধারাবাহিকভাবে ভালো খেলে যেতে থাকেন তিনি। এই সময়েই জার্মানিতে, বুন্দেসলিগায় বায়ার্নের রাজত্ব পাকাপোক্ত হতে শুরু করে।
অবশ্য এই সময় থেকেই দলে তার প্রভাবও একটু একটু কমতে শুরু করে। বয়স এবং ইঞ্জুরির কারণে প্লেইং টাইম কমে আসে। গার্দিওলার সময় থেকেই শোয়ান্সটাইগারের গুরুত্ব কমতে থাকে। জার্মানির জাতীয় দলেও নিয়মিত মুখ ছিলেন শোয়েনস্টেইগার।
অবশ্য সেখানে তার শুরুটা যে খুব সুখকর ছিল, তা বলা যাবে না। ২০০৪ সালের ৬ জুন, ১৯ বছর বয়সে প্রিয় বন্ধু লুকাস পোডলস্কি ও তিনি একসাথে জাতীয় দলে অভিষিক্ত হন। সেটি ছিল ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে হাঙ্গেরির বিপক্ষে একটি ওয়ার্ম-আপ ম্যাচ। ২-০ গোলে সেই ম্যাচে হেরে যায় জার্মানি।
এরপর পর্তুগালে ইউরো ২০০৪-এও গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয় তাঁরা। জাতীয় দলে শোয়েনস্টেইগারের আরেকটি বেদনাময় সময় আসে ২০০৬ বিশ্বকাপে। ততদিনে তিনি ও তার বন্ধু পোডলস্কি দুজনেই জার্মান দলে নিজেদের জায়গা পাকা করে নিয়েছেন।
স্বপ্ন দেখছেন নিজেদের প্রথম ও জার্মানির চতুর্থ বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ের। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইটালির বিপক্ষে সেমিফাইনালে অতিরিক্ত সময়ে হার মানতে হয় তাদের। সেই ম্যাচে ৭৩তম মিনিটে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নেমেছিলেন শোয়েনস্টেইগার, কিন্তু দলের শেষ রক্ষা করতে পারেননি। এর বছর দুয়েক পরেই প্রথমবারের মতো জাতীয় দলের অধিনায়ক হওয়ার গৌরব অর্জন করেন শোয়েনস্টেইগার। ২০০৮ সালের আগস্টে বেলজিয়ামের বিপক্ষে একটি ফ্রেন্ডলি ম্যাচের হাফ টাইম শেষে বিশ্রামের সিদ্ধান্ত নেন মিরোস্লাভ ক্লোসা।
তখনই শোয়েনস্টেইগারকে ক্যাপটেন’স আর্মব্যান্ডটি পরিয়ে দেন তিনি। ২৪ বছর বয়সী শোয়েনস্টেইগার উপলক্ষ্যটিকে স্মরণীয় করে রাখেন পেনাল্টি স্পট থেকে গোল করে জার্মানিকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে নেয়ার মাধ্যমে। সব মিলিয়ে জাতীয় দলের হয়ে ১২১টি ম্যাচ খেলেন শোয়েনস্টেইগার। তবে ২০১৪ বিশ্বকাপের স্কোয়াডে তার অন্তর্ভুক্তি নিয়ে অনেকের মনেই ছিল সংশয়।
কেননা তাদের ধারণা ছিল, ইতোমধ্যেই নিজের সেরা সময়টা পেছনে ফেলে এসেছেন তিনি। কিন্তু সকল সংশয়বাদীর মুখে চুনকালি মাখিয়ে দিয়ে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ফাইনালে অসাধারণ নৈপুণ্য দেখান তিনি। ওই খেলায় অতিরিক্ত সময়ে সার্জিও আগুয়েরোর ট্যাকেলে মারাত্মকভাবে আহত হন তিনি। নাকমুখ থেকে অনবরত রক্ত পড়তে থাকে। কিন্তু একজন হার না মানা যোদ্ধার মতই খেলা চালিয়ে যান এবং অবশেষে ম্যাচের শেষ মুহুর্তে এদিকে দীর্ঘ ১৩ বছর বায়ার্ন মিউনিখের মূল দলে কাটানোর পর ২০১৫ সালে ইংল্যান্ডে পাড়ি জমান বাস্তি। যোগ দেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে। সেখানে সিংহভাগ সময় ইনজুরির সাথে লড়াই করতে হয় তাকে।
সুযোগ পান ৩৫টি ম্যাচে, যার মধ্যে প্রিমিয়ার লিগ ম্যাচ ছিল স্রেফ ১৮টি। তারপরও ইংলিশ দলটির হয়ে তিনি জিতে নেন এফএ কাপ এবং ইউরোপা লিগ। ২০১৭ সালে শোয়েনস্টেইগারের নতুন ঠিকানা হয় যুক্তরাষ্ট্রে মেজর লিগ সকারের দল শিকাগো ফায়ার। ২০১৯ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ফায়ারের হয়ে ৯২ ম্যাচ খেলে গোল পান আটটি, যার মধ্যে অষ্টমটি আসে তাঁর সর্বশেষ ম্যাচে। এরপরই পেশাদার ফুটবল ক্যারিয়ারকে বিদায় বলে দেন তিনি।
