বিশ্বকাপের প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে মরক্কো জাতীয় ফুটবল দলের প্রধান কোচের পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন ওয়ালিদ রেগরাগুই। বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে তিনি দেশটির ফুটবল অঙ্গনে নতুন আলোচনা ও বিস্ময়ের জন্ম দেন। কারণ ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের আর খুব বেশি সময় বাকি নেই। এমন একটি সময় দলের দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত অনেকের কাছেই অপ্রত্যাশিত বলে মনে হয়েছে।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই রেগরাগুইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা গুঞ্জন চলছিল। শেষ পর্যন্ত সব জল্পনার অবসান ঘটিয়ে তিনি নিজেই পদত্যাগের ঘোষণা দেন। নিজের সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রেগরাগুই জানান, দীর্ঘ সময় ধরে জাতীয় দলের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। প্রায় চার বছর দায়িত্ব পালনের পর তিনি মনে করেন, দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে নতুন নেতৃত্বের জন্য জায়গা করে দেওয়া প্রয়োজন।
রেগরাগুইয়ের নেতৃত্বেই মরক্কো ফুটবল সাম্প্রতিক সময়ে ইতিহাসের অন্যতম সেরা সময় পার করে। বিশেষ করে ২০২২ সালে কাতারে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে তার অধীনেই মরক্কো সেমিফাইনালে পৌঁছে বিশ্ব ফুটবলে নজির স্থাপন করে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে কোনো আফ্রিকান দেশের এটিই ছিল সর্বোচ্চ সাফল্য। সেই আসরে গ্রুপ পর্বে শক্তিশালী প্রতিপক্ষদের মোকাবিলা করার পর নকআউট পর্বে স্পেন ও পর্তুগালের মতো শক্তিশালী ইউরোপীয় দলকে পরাজিত করে শেষ চারে জায়গা করে নেয় মরক্কো। তাদের এই সাফল্য আফ্রিকা ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায়।
রেগরাগুইয়ের কোচিং আমলে মরক্কো দল ধারাবাহিকভাবে উন্নতি করেছে। তার অধীনে দলটি মোট ৪৯টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছে এবং এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জয় পেয়েছে। একই সঙ্গে ফিফা র্যাঙ্কিংয়েও মরক্কোর অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে এবং আফ্রিকার অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে।
তার সময়েই মরক্কো জাতীয় দল টানা ১৯টি ম্যাচ জয়ের অসাধারণ রেকর্ড গড়ে। ২০২৪ সালের জুন থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এই জয়ধারা অব্যাহত ছিল। আন্তর্জাতিক ফুটবলে এত দীর্ঘ সময় জয় ধরে রাখা খুব কম দলের পক্ষেই সম্ভব হয়। ফলে এই সাফল্য মরক্কো ফুটবলের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
রেগরাগুইয়ের বিদায়ের পর নতুন কোচ হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সম্ভাব্য নাম হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন তরুণ কোচ মোহাম্মদ ওয়াহবি। ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, তিনি ইতোমধ্যেই কোচিং দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন। গত বছর চিলিতে অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব–২০ বিশ্বকাপে তার নেতৃত্বেই মরক্কো দল শিরোপা জেতে। ফলে জাতীয় দলের দায়িত্ব তার হাতে গেলে তরুণ ফুটবলারদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রেগরাগুইয়ের বিদায়ের পর মরক্কো দলের অধিনায়ক আশরাফ হাকিমি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন বার্তায় সাবেক কোচকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, রেগরাগুই শুধু একজন কোচ নন; তিনি এমন একজন নেতা যিনি খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছেন এবং পুরো জাতিকে অনুপ্রাণিত করেছেন। তার নেতৃত্ব, আবেগ ও দূরদর্শিতা মরক্কো ফুটবলের ইতিহাসে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
রেগরাগুইয়ের কোচিং আমলের প্রধান পরিসংখ্যান নিচে তুলে ধরা হলো—
| সূচক | পরিসংখ্যান |
|---|---|
| মোট ম্যাচ | ৪৯ |
| জয় | ৩৬ |
| ড্র | ৮ |
| হার | ৫ |
| টানা জয় | ১৯ ম্যাচ |
| বড় অর্জন | ২০২২ বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল |
এদিকে আসন্ন বিশ্বকাপের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে মরক্কো এ মাসেই দুটি আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ খেলবে। ২৭ মার্চ স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদে ইকুয়েডরের বিপক্ষে মাঠে নামবে দলটি। এরপর চার দিন পর ফ্রান্সের লেন্স শহরে প্যারাগুয়ের মুখোমুখি হবে তারা। দলীয় সমন্বয়, কৌশল এবং খেলোয়াড়দের প্রস্তুতি যাচাইয়ের জন্য এই ম্যাচগুলোকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২০২৬ সালের বিশ্বকাপে মরক্কো খেলবে গ্রুপ ‘সি’-তে। এই গ্রুপে তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে রয়েছে ব্রাজিল, স্কটল্যান্ড ও হাইতি। শক্তিশালী ব্রাজিলের উপস্থিতির কারণে গ্রুপটি কঠিন হলেও মরক্কোর সমর্থকরা আশাবাদী—নতুন কোচের অধীনে দলটি আবারও চমক দেখাতে পারবে এবং বিশ্বমঞ্চে নিজেদের শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হবে।
