দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার পর পৃথিবী যখন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে শুরু করে, তখন ফুটবলও ফিরে আসে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। ১৯৪২ ও ১৯৪৬ সালের বিশ্বকাপ যুদ্ধের কারণে আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ ১২ বছরের বিরতির পর ১৯৫০ সালে আবার অনুষ্ঠিত হয় ফুটবল বিশ্বকাপ। আয়োজক দেশ ছিল ব্রাজিল। যুদ্ধোত্তর বিশ্বের জন্য এই আয়োজন কেবল একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ছিল না; এটি ছিল পুনর্গঠন, পুনর্জাগরণ এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার প্রতীক।
বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পাওয়ার পর ব্রাজিল বিশাল প্রস্তুতি নেয়। রিও ডি জেনেইরোতে নির্মাণ করা হয় ঐতিহাসিক মারাকানা স্টেডিয়াম। সে সময় এটিকে বিশ্বের বৃহত্তম ফুটবল স্টেডিয়াম হিসেবে বিবেচনা করা হতো। নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ না হলেও বিপুলসংখ্যক দর্শক ধারণের লক্ষ্যেই এটি প্রস্তুত করা হয়েছিল। সরকারি হিসাব ও বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, ফাইনাল ম্যাচে প্রায় দুই লাখ দর্শক উপস্থিত ছিলেন বলে ধারণা করা হয়।
এই বিশ্বকাপের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল ফিফা সভাপতি জুল রিমে-এর। যুদ্ধকালীন অস্থিরতার মধ্যেও তিনি বিশ্বকাপ ট্রফি সংরক্ষণ করেছিলেন। তাঁর নেতৃত্বেই বিশ্বকাপ আবার আন্তর্জাতিক ক্রীড়াজগতে ফিরে আসে।
১৯৫০ সালের আসরে কয়েকটি দেশ অংশ নেয়নি বা শেষ পর্যন্ত সরে দাঁড়ায়। স্কটল্যান্ড যোগ্যতা অর্জন করেও অংশ নেয়নি। তুরস্ক সফরসংক্রান্ত জটিলতায় সরে দাঁড়ায়। আর্জেন্টিনা অভ্যন্তরীণ ফুটবল প্রশাসনিক দ্বন্দ্বের কারণে অংশ নেয়নি। যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতির কারণে জার্মানি এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন-ও অনুপস্থিত ছিল।
নিচে ১৯৫০ বিশ্বকাপের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরা হলো—
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| আয়োজক দেশ | ব্রাজিল |
| আসরের সময় | ২৪ জুন – ১৬ জুলাই ১৯৫০ |
| অংশগ্রহণকারী দল | ১৩টি |
| চ্যাম্পিয়ন | উরুগুয়ে |
| রানার্সআপ | ব্রাজিল |
| সর্বোচ্চ গোলদাতা | আদেমীর (৯ গোল) |
| ফাইনাল ভেন্যু | মারাকানা স্টেডিয়াম |
| ফাইনাল ম্যাচ | ব্রাজিল ১-২ উরুগুয়ে |
বিশ্বকাপে ব্রাজিল ছিল সবচেয়ে আলোচিত দল। আদেমীর, জিজিনো ও জাইরের মতো ফুটবলারদের আক্রমণাত্মক ফুটবল দর্শকদের মুগ্ধ করেছিল। চূড়ান্ত পর্বে তারা সুইডেন-কে ৭-১ এবং স্পেন-কে ৬-১ গোলে হারায়। ফলে পুরো ব্রাজিলে বিশ্বাস তৈরি হয় যে শিরোপা তাদের হাতেই যাচ্ছে।
অন্যদিকে ইংল্যান্ড বড় প্রত্যাশা নিয়ে অংশ নেয়। স্ট্যানলি ম্যাথিউস, টম ফিনি ও বিলি রাইটের মতো তারকাদের নিয়ে দলটি নিজেদের শক্তিশালী দাবিদার মনে করছিল। কিন্তু গ্রুপ পর্বে তারা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ১-০ গোলে পরাজিত হয়। জো গাইটজেন্সের গোল সেই ম্যাচকে বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটনে পরিণত করে।
ইতালি দলটি এসেছিল শোকাহত অবস্থায়। ১৯৪৯ সালের সুপারগা বিমান দুর্ঘটনায় ইতালির বিখ্যাত তোরিনো ক্লাবের বহু খেলোয়াড় নিহত হন, যাদের অনেকেই জাতীয় দলের সদস্য ছিলেন। ফলে দলটির শক্তি আগের তুলনায় অনেক কমে যায়।
১৯৫০ বিশ্বকাপের নির্ধারক ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় ১৬ জুলাই, মারাকানায়। প্রতিপক্ষ ব্রাজিল ও উরুগুয়ে। সে সময়ের নিয়ম অনুযায়ী এটি আনুষ্ঠানিক ফাইনাল ছিল না; তবে চূড়ান্ত গ্রুপের শেষ ম্যাচ হওয়ায় কার্যত এটিই শিরোপা নির্ধারণ করে।
ব্রাজিলের জন্য ড্র করলেই শিরোপা নিশ্চিত ছিল। ম্যাচের আগে পুরো দেশে উৎসবের পরিবেশ তৈরি হয়। সংবাদপত্রগুলো আগাম বিজয়ের শিরোনাম প্রকাশ করেছিল। স্টেডিয়ামেও বিজয় উদ্যাপনের প্রস্তুতি ছিল।
ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে ব্রাজিল প্রথমে এগিয়ে যায় ফ্রিয়াকার গোলে। কিন্তু উরুগুয়ে হাল ছাড়েনি। হুয়ান আলবার্তো শিয়াফিনো সমতা ফেরান। এরপর আলসিদেস ঘিগিয়া ডান দিক দিয়ে আক্রমণ চালিয়ে নির্ধারক গোলটি করেন। উরুগুয়ে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায় এবং সেই ফলই শেষ পর্যন্ত বজায় থাকে।
ম্যাচ শেষে মারাকানা স্টেডিয়ামে নেমে আসে গভীর নীরবতা। এই পরাজয় ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে “মারাকানাজো” নামে পরিচিত হয়ে যায়। অন্যদিকে উরুগুয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ শিরোপা জেতে।
উরুগুয়ের অধিনায়ক ওবদুলিও ভারেলা পরে বলেছিলেন, তারা জানতেন ব্রাজিল শক্তিশালী দল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার বিশ্বাসই তাদের জয় এনে দেয়। ১৯৫০ সালের সেই ম্যাচ আজও বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম স্মরণীয় ও নাটকীয় অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
