এশিয়ার শক্তিশালী দলগুলোর বিপক্ষে লড়াই কতটা কঠিন হতে পারে, তা এবার স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করল বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল। তুলনামূলক দুর্বল প্রতিযোগিতায় সীমিত প্রস্তুতি নিয়ে যখন একটি দল মহাদেশীয় পর্যায়ের টুর্নামেন্টে অংশ নেয়, তখন বড় শক্তির সামনে তাদের দুর্বলতা সহজেই প্রকাশ পায়। এশিয়ান কাপের বাছাইপর্বে উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের ৫–০ গোলের পরাজয় শুধু একটি ম্যাচের ফল নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রস্তুতির জন্য একটি বড় শিক্ষা হিসেবেই বিবেচিত হতে পারে।
টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণের আগে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ খেলার প্রয়োজনীয়তার কথা বহুবার উল্লেখ করেছিলেন দলের কোচ পিটার বাটলার। কিন্তু সেই প্রস্তুতির সুযোগ খুব বেশি তৈরি হয়নি। ফলে চীন ও উত্তর কোরিয়ার মতো উচ্চমানের দলের বিপক্ষে মাঠে নামার সময় পার্থক্যটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
গ্রুপপর্বের প্রথম ম্যাচে চীনের বিপক্ষে বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে সংগঠিত ফুটবল খেলেছিল। দ্রুত পাল্টা আক্রমণ, দূরপাল্লার পাস এবং উইং থেকে ক্রস—এসব মোকাবিলায় দলটি কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পেরেছিল। তবে উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে দৃশ্যপট ছিল ভিন্ন। শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকা উত্তর কোরিয়া বাংলাদেশের রক্ষণভাগকে ক্রমাগত চাপে রাখে।
ম্যাচের পরিসংখ্যানই বলছে প্রতিদ্বন্দ্বিতার পার্থক্য কতটা বড় ছিল।
| পরিসংখ্যান | উত্তর কোরিয়া | বাংলাদেশ |
|---|---|---|
| মোট শট | ৩১ | ০ |
| লক্ষ্যভেদী শট | ১১ | ০ |
| বল দখল | প্রায় ৭০% | প্রায় ৩০% |
| গোল | ৫ | ০ |
উত্তর কোরিয়ার আক্রমণের তীব্রতা এতটাই ছিল যে গোলের ব্যবধান আরও বড় হতে পারত। তবে বাংলাদেশের গোলরক্ষক মিলি আক্তারের দৃঢ়তা দলকে বড় ব্যবধানে হার থেকে কিছুটা রক্ষা করেছে। পাঁচটি গোল হজম করলেও তিনি আরও কয়েকটি নিশ্চিত গোলের সুযোগ ঠেকিয়ে দেন, যা দলের জন্য উল্লেখযোগ্য সান্ত্বনা।
রক্ষণভাগেও কিছু ইতিবাচক দিক ছিল। শামসুন্নাহার সিনিয়র, নবীরণ খাতুন, আইরিন খাতুন, কোহাতি কিসকু ও আফঈদা খন্দকার শুরুতে বেশ সংগঠিতভাবে প্রতিপক্ষের আক্রমণ সামাল দেন। বিশেষ করে দুই প্রান্ত দিয়ে আসা আক্রমণ ঠেকাতে লেফটব্যাক শামসুন্নাহার এবং রাইটব্যাক কোহাতির ভূমিকা উল্লেখযোগ্য ছিল। মাঝমাঠের মারিয়া মান্দা ও মনিকা চাকমাও রক্ষণে নেমে এসে সহায়তা করার চেষ্টা করেন।
তবে আক্রমণভাগে বাংলাদেশ কার্যত অকার্যকর ছিল। পুরো ম্যাচে প্রতিপক্ষের গোলমুখে একটি শটও নিতে পারেনি দলটি। দ্বিতীয়ার্ধে কিছুটা সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা দেখা গেলেও আক্রমণ গড়ে তোলার মতো সুযোগ তৈরি হয়নি।
র্যাঙ্কিংয়ের দিক থেকেও দুই দলের পার্থক্য বিশাল। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশ যেখানে ১১২তম, সেখানে উত্তর কোরিয়া প্রায় শতাধিক ধাপ এগিয়ে। তাদের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও অনেক সমৃদ্ধ।
| সূচক | উত্তর কোরিয়া | বাংলাদেশ |
|---|---|---|
| ফিফা র্যাঙ্কিং | শীর্ষ ১০–এর কাছাকাছি | ১১২ |
| নারী বিশ্বকাপ অংশগ্রহণ | ৪ বার | নেই |
| এশিয়ান কাপ অংশগ্রহণ | ১০ বার | সীমিত |
| এশিয়ান কাপ শিরোপা | ৩ বার | নেই |
এই বাস্তবতা সামনে এনে দিয়েছে বাংলাদেশের নারী ফুটবলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা। দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিযোগিতায় সাফল্য পেলেও এশিয়ার বৃহত্তর মঞ্চে টিকে থাকতে হলে আরও শক্তিশালী প্রস্তুতি, উন্নত লিগ কাঠামো এবং নিয়মিত আন্তর্জাতিক ম্যাচের বিকল্প নেই।
ফলাফল যাই হোক, এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের ফুটবলারদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়ে থাকবে। শক্তিশালী দলের বিপক্ষে খেলেই বোঝা যায় উন্নতির পথ কোথায়। সেই উপলব্ধি থেকেই ভবিষ্যতের পথরেখা নির্ধারণ করাই এখন বাংলাদেশের নারী ফুটবলের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
