বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে ম্যাচ পাতানো বা ফিক্সিংয়ের মতো অনৈতিক কর্মকাণ্ড ঠেকাতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নজরদারি ও আইনগত ব্যবস্থায় কিছুটা অগ্রগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। স্পোর্টস ডেটা বিশ্লেষণী প্রতিষ্ঠান স্পোর্টরাডারের প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন ‘ইন্টেগ্রিটি ইন অ্যাকশন ২০২৫: গ্লোবাল অ্যানালাইসিস অ্যান্ড ট্রেন্ডস’ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৭০টি খেলায় অনুষ্ঠিত ১০ লাখের বেশি ক্রীড়া ইভেন্ট পর্যবেক্ষণ করে মোট ১,১১৬টি ম্যাচকে সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০২৪ সালের তুলনায় এ হার প্রায় ১ শতাংশ কম, যা সামগ্রিকভাবে ইতিবাচক প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, কঠোর আইনি প্রয়োগ এবং ক্রীড়াঙ্গনে সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক উদ্যোগের ফলে এই অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে। বিশ্বব্যাপী অনুষ্ঠিত ক্রীড়া ইভেন্টের ৯৯.৫ শতাংশের বেশি কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণের আওতায় ছিল। এতে বোঝা যায়, আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থা ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ ধীরে হলেও কার্যকর হচ্ছে।
আঞ্চলিক দিক থেকে ইউরোপে এখনও সবচেয়ে বেশি সন্দেহজনক ম্যাচ শনাক্ত হয়েছে। তবে আশার কথা, ২০২৪ সালের তুলনায় ইউরোপে এ সংখ্যা ৬৬টি কমে ৩৮৫-এ নেমেছে। দক্ষিণ আমেরিকায়ও উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা গেছে—সেখানে সন্দেহজনক ম্যাচের সংখ্যা কমেছে ৬৪টি। বিপরীতে এশিয়া, আফ্রিকা এবং উত্তর ও মধ্য আমেরিকায় সামান্য বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে, যা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে।
খেলাভিত্তিক বিশ্লেষণে ফুটবল বরাবরের মতোই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। ২০২৫ সালে ফুটবলে সন্দেহজনক ম্যাচ শনাক্ত হয়েছে ৬১৮টি, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ১৫ শতাংশ কম। তবু অন্য যেকোনো খেলাধুলার তুলনায় এ সংখ্যা প্রায় তিন গুণ বেশি। ফুটবলের পরেই রয়েছে বাস্কেটবল, এরপর টেনিস, টেবিল টেনিস ও ক্রিকেট। এতে স্পষ্ট হয়, ম্যাচ পাতানো কেবল একটি খেলায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং বিভিন্ন খেলায় ছড়িয়ে পড়ছে।
ক্রিকেটে পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। ২০২৫ সালে ক্রিকেটে সন্দেহজনক ম্যাচের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৯-এ, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় তিন গুণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বজুড়ে টি-টোয়েন্টি ম্যাচের সংখ্যা দ্রুত বাড়ায় স্পট ফিক্সিংয়ের সুযোগও বেড়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ক্রিকেটে সন্দেহজনক ঘটনার বড় অংশই ফলাফল বদলের চেয়ে নির্দিষ্ট ওভার বা বলকে প্রভাবিত করার চেষ্টা—অর্থাৎ স্পট ফিক্সিংয়ের সঙ্গে জড়িত।
নিচের ছকে ২০২৫ সালে খেলাভিত্তিক সন্দেহজনক ম্যাচের চিত্র তুলে ধরা হলো:
| খেলা | সন্দেহজনক ম্যাচের সংখ্যা (২০২৫) |
|---|---|
| ফুটবল | ৬১৮ |
| বাস্কেটবল | ২৩৩ |
| টেনিস | ৭৮ |
| টেবিল টেনিস | ৬৫ |
| ক্রিকেট | ৫৯ |
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে প্রতি ৩২৬টি ম্যাচের মধ্যে গড়ে একটি ম্যাচ সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ফুটবলে মোট সন্দেহজনক ম্যাচের অংশ ২০২৪ সালের ৬৫ শতাংশ থেকে কমে ২০২৫ সালে ৫৫ শতাংশে নেমে এসেছে, যা একটি ইতিবাচক পরিবর্তন। তবে আফ্রিকায় ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সন্দেহজনক ম্যাচের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণের কাছাকাছি বেড়ে যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানানো হয়েছে।
স্পোর্টরাডারের ইন্টেগ্রিটি সার্ভিসের নির্বাহী সহসভাপতি আন্দ্রিয়াস ক্র্যান্নিচ বলেছেন, ম্যাচ ফিক্সিং এখনও ক্রীড়াজগতের জন্য একটি ক্রমবর্ধমান হুমকি। তাঁর মতে, প্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য, শিক্ষা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় ধারাবাহিক বিনিয়োগ ছাড়া এ অনৈতিক চক্রের সঙ্গে কার্যকরভাবে লড়াই করা সম্ভব নয়।
