লাঠি খেলার আইন কানুন । খেলাধুলার আইন

লাঠি খেলার আইন কানুন আজকের আলোচনার বিষয়। লাঠি খেলা একটি প্রাচীন খেলা। এই খেলাটির সঠিক উৎপত্তি কোথায় তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে বাংলাদেশে এ খেলাটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে এ খেলার জনপ্রিয়তা তুঙ্গে বলা যায়। এ কারণে লাঠি খেলাকে গ্রামবাংলার খেলাধূলা হিসাবে গণ্য করা হয়। লাঠি খেলা, খেলা ছাড়াও শরীর চর্চা হিসাবেও যথেষ্ট উপকারে আসে।

শীতের প্রারম্ভে কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসে এই খেলা অধিক হারে অনুষ্ঠিত হয়। তখন প্রায় প্রতিটি গ্রামেই যেন উৎসব উৎসব মনে হয়। এই খেলাকে কেন্দ্র করে প্রায় প্রতিটি গ্রামে আনন্দের জোয়ার বয়ে যায়। খেলা শেষে রাতে অনেক স্থানে গান বাজনারও আসর বসে।

আমাদের দেশে লাঠি খেলার কোন ফেডারেশন নেই। ফলে এই খেলার কোন সঠিক নিয়ম-কানুনও নেই। সে কারণে বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন নিয়মে লাঠি খেলা হতে দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় এক স্থানের খেলার সাথে অন্য স্থানের খেলার কোন মিল নেই। লাঠি খেলায় বিভিন্ন রকম খেলা প্রদর্শন করে থাকেন লাঠিয়ালরা।

 

লাঠি খেলার আইন কানুন । খেলাধুলার আইন

 

লাঠি খেলার আইন কানুন । খেলাধুলার আইন

নিচে লাঠি খেলা সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলোঃ

বড় লাঠি

লাঠি খেলায় বিভিন্ন রকমের লাঠি ব্যবহার করা হয়। লাঠির কোন সঠিক আকার বা আকৃতি নেই। রং খেলায় যারা অভ্যস্ত তারা বড় লাঠি খেলা খেলে থাকেন। বড় লাঠি খেলা হয় ফ্রি-স্টাইল পদ্ধতিতে। খেলা হয় অনেকটা যুদ্ধাকারে। কেউ কোন বাধা মানে না। যে তার প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করতে পারে সেই জয়ী হয়।

ছোট লাঠি

ছোট লাঠি সাধারণতঃ লাঠিয়ালের নিজের হাতের আড়াই হাত লম্বা হয়ে থাকে। এই লাঠির যে দিকটা ধরা হয়, সে দিকটা কিছুটা মোটা ও সামনের দিক অনেকটা সরু হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে লাঠি বাঁশের তৈরি হয়।

সবচেয়ে বড় লাঠি

লাঠি খেলার মধ্যে আকর্ষণীয় খেলা হলো সবচেয়ে বড় লাঠির খেলা। এই খেলা বিভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। বড় লাঠির দৈর্ঘ হবে লাঠিয়ালের দাড়ানো অবস্থায় পায়ের তলা থেকে মাথার উপরে এক হাত তুলে যে পর্যন্ত পায় ততটুকু। প্রয়োজনে লাঠিয়াল আরো বড় বা ছোট লাঠি ব্যবহার করতে পারেন। লাঠি তৈরি হয় বাঁশের।

লাঠি ধরা

লাঠির প্রান্ত থেকে এক হাত ছেড়ে ধরতে হবে। ছোট লাঠির ক্ষেত্রে আরো কম ছেড়ে ধরা হবে । বাঁ হাত থাকবে একহাত দূরে। লাঠি খেলা বা ঘোরাবার জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়ে থাকে, পদ্ধতি বা প্যাচগুলির মধ্যে অনুলোমন, বিলোম, সম্মুখ, পৃষ্ঠাবেষ্টন, শিরাবেষ্টন, চমক, সমকাবর্তন, থমকাবর্তন, ক্রীবর্তন, উৎকণ্ঠ চমক, ক্রন্দাবর্তন, ভাঙ্গকরণ প্রভৃতি। প্রারম্ভে এইগুলি বা স্থানীয় প্রচলিত খেলা দাঁড়িয়ে অভ্যাস করতে হয় । পরে নড়েচড়ে বা লাফিয়ে খেলা হয় ।

 

লাঠি খেলার আইন কানুন । খেলাধুলার আইন

 

বড় লাঠির রং খেলা

বড় লাঠি আয়ত্ত্বে এলেই বড় লাঠির রং খেলা শেখা যায়। এই খেলায় একপক্ষ মারতে গেলেই অন্য পক্ষ তা প্রতিরোধ করবে। এই খেলা শুরুর আগেই জানিয়ে দিতে হবে কে কি বিষয়ে খেলবে। এই খেলায় বিভিন্ন রকমের আঘাত করা যায়। যেমন, ঘাত, বিঘাত, সমঘাত প্রভৃতি। বিভিন্ন জায়গায় আঘাতকে বিভিন্ন নামে অবিহিত করা হয়। যেমনঃ শির, তামেচা, বাহেরা, ডাক্তার, কটি, মন, দে, পালটি, কড়ক, হুল প্রভৃতি।

নিচে কয়েকটি আঘাত নিয়ে আলোচনা করা হলোঃ

শির

শির অর্থ মাথা। অর্থাৎ, মাথার সিঁথির দুই আঙ্গুল বাদ দিয়ে আরম্ভ করে বা ফ্রন, বা চোখ, নাকের সামনের দিক এবং ডান কটির পাশ ভেদ করে আঘাত করলে শিরে আঘাত বুঝায় । তবে এই আঘাত হবে প্রতীক আঘাত মাত্ৰ । লাঠি বাঁ দিক থেকে পিঠের সমান্তরাল পিছন দিক ঘুরিয়ে নিয়ে হাতের মুঠি ডান কাঁধের উপর এলে, লাঠির সামনের দিকটা উপরে তুলে হাত সম্পূর্ণ সরল করে স্থির লক্ষ্যে পৌঁছতে হয়। প্রতিপক্ষ শিরে আঘাতের চেষ্টা করলে লাঠিয়াল তা প্রতিহত করার জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকবেন।

মোড়া

ডান বক্ষ মুণ্ডু থেকে শুরু করে বাঁ বুকের দু’আঙ্গুল নিয়ে অথবা বুকের পাশ পর্যন্ত ছেদ করা হেতু আঘাত মোড়া প্রতিরোধকালে লাঠি ধরলে হাতের মুঠোর বুড়ো আঙ্গুল ডান কাঁধ মোড়ার প্রায় চার আঙ্গুল ডানে ও চার আঙ্গুল নিচের এবং একটু সামনে থাকবে। লাঠির মাথা বাঁ মোড়া থেকে আধ হাত সামনে লম্ব রেখায় সমানভাবে উঁচু থাকবে।

লাঠির বুকের সমান্তরাল প্রসস্তিক্ষেত্র অবলম্বন করে থাকবে। প্রতিরোধের সময় সর্বদা নিজের লাঠির দ্বারা প্রতিপক্ষের লাঠিকে তার গতির বিপরীত দিকে সামান্য বেগে আঘাত করে ফিরিয়ে দিতে হবে।

 

লাঠি খেলার আইন কানুন । খেলাধুলার আইন

 

অন্তর

ডান কানের দু’আঙ্গুল নিচে থেকে আরম্ভ করে মাথা গলার ঠিক সন্ধিমূল ভেদ করে। বাঁ কানের দু’আঙ্গুল নিচ পর্যন্ত ছেদ করে দেয়ার জন্য যে আঘাত করা হয় তাকে অন্তর বলা হয়।

অন্তর প্রতিরোধকালে লাঠি ঠিক লম্বাভাবে উপরের দিকে মুখ করে থাকবে। এই সময় হাতের মুঠির বুড়ো আঙ্গুলগুলি ডান কাঁধের প্রায় চার আঙ্গুল নিচে, চার আঙ্গুল ডানে এবং আধ হাত সামনে থাকবে।

কুচ

পায়ের সংযোগস্থলে বাঁ দিকের ঘুন্টিকাটি ঘিরে চার আঙ্গুল স্থানের মধ্যে সামান্য নিচের দিক করে বাঁকাভাবে পদ সন্ধি বিচ্ছিন্ন করার জন্য যে আঘাত করা হয় তাকে বলা হয়।

লাঠি খেলা

কুচের আঘাত প্রতিরোধ করার জন্য তার লাঠির আঘাত করে দূর করে দিতে হবে এবং সেই গতিতেই বাঁ পাশ দিয়ে ক্রমে উর্দ্ধমুখ হয়ে বুকের সমান্তরালভাবে ঘুরিয়ে নিয়ে ও পরে হাতের মুঠি ও বাঁ কাধের উপরে এনে পুনরায় অন্তর মারার বা আঘাত করার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

 

লাঠি খেলার আইন কানুন । খেলাধুলার আইন

 

তামেচা

বাঁ কান থেকে আরম্ভ করে নাকের অগ্রভাগ ভেদ করে ডান কানের মূল পর্যন্ত আঘাত করার জন্য যে আঘাত করা হয় তাকে তামেচা বলা হয় ।

তামেচা প্রতিরোধ করতে হাতের মুঠির বুড়ো আঙ্গুল বাঁ কাঁধের মোড় থেকে প্রায় চার আঙ্গুল উপরে ও আধ হাত সামনে লাঠি থাকবে এবং লাঠির মাথার অংশ ডান কাঁধ মোড়ের আধ হাত সামনে থেকে লম্ব রেখায় উপরে থাকবে।

বাহেরা

ডান কান থেকে আরম্ভ করে নাকের অগ্রভাগ ভেদ করে বাঁ কান পর্যন্ত আঘাত করার নিমিত্তে যে আঘাত করা হয় তাই বাহেরা। বাহেরা প্রতিরোধ করতে হাতের মুঠোর মুঠোর বুড়ো আঙ্গুল ডান ঘাড়ের মেড়ে থেকে প্রায় চার আঙ্গুল উপরে আধ হাত সামনের দিক থেকে লম্ব রেখার সমান উঁচুতে থাকবে ।

 

কটি

ডান কটি পার্শ্ব থেকে আরম্ভ করে ঠিক সরলভাবে বাম কটি পার্শ্ব পর্যন্ত ছেদ করা হেতু যে আঘাত তাকে কটি বলা হয় ।
কটি প্রতিরোধকালে হাতের মুঠোর ডান বুকের পাশের আধ হাত ডানের ও প্রায় এক হাত সামনে থাকবে। লাঠি ভূমির উপরে লম্বালম্বি সমসূত্রে থাকবে।

রেফারি

অনেক স্থানে লাঠি খেলা পরিচালনার জন্য রেফারি থাকেন। আবার অনেক খেলায় কোন রেফারি থাকে না। বিষয়টি নির্ভর করে আয়োজনকারীদের উপরে। অনেক স্থানে খেলা শেষে পুরষ্কার দেয়া হয়।

Leave a Comment