ভারতের নারী অলরাউন্ডার দীপ্তি শর্মা আবারও প্রমাণ করলেন তাঁর দৃঢ় মনোবল, প্রতিশ্রুতি ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির জয়। আগ্রা থেকে মুম্বই যাওয়ার আগে তাঁর ভাই সুমিত শর্মাকে এক অঙ্গীকার করেছিলেন দীপ্তি—“যাই হোক না কেন, আমি বিশ্বকাপ ট্রফিটা ভারতের হাতছাড়া হতে দেব না।”
সুমিত জানালেন, “ফাইনালের আগে সে আমাকে বলেছিল, ‘ভাইয়া, আমরা আগেও দু’বার ফাইনালে পৌঁছেছি। বিশেষ করে ২০১৭ সালে আমরা মাত্র ৯ রানের জন্য বিশ্বকাপ হাতছাড়া করেছি। এইবার আমি আমার সর্বোচ্চটা দেব। ব্যাট, বল বা ফিল্ড—যাই হোক না কেন, আমি আমার ১০০ শতাংশ দেব।’ ম্যাচ জেতার পর মাঠে দেখা হতেই সে হাসিমুখে বলল, ‘ভাইয়া, আমি প্রতিশ্রুতি রেখেছি, তাই না?’ সত্যিই, সে তার কথা রেখেছে।”
তিন ভূমিকায় এক দীপ্তি
দীপ্তির পারফরম্যান্স যেন এক ম্যাচে তিনটি ম্যাচ খেলার সমান। ফাইনালে তিনি ব্যাট হাতে ৫৮ বলে ৫৮ রানের ইনিংস খেলেন, যা ভারতের স্কোর প্রায় ৩০০ ছুঁই ছুঁই করে তোলে। ফিল্ডে অসাধারণ থ্রো দিয়ে রানআউট করেন এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে। আর বল হাতে তিনি ছিলেন অতুলনীয়—৫ উইকেট নেন মাত্র ৩৯ রানে। তাঁর শিকার ছিলেন সেঞ্চুরিয়ান লরা উলভার্ডট ও ভালোভাবে সেট থাকা আনরিরি ডার্কসেন। ম্যাচের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্ত আসে যখন তাঁর এক ডিপিং ফুল টস ডেলিভারি নাদিন ডি ক্লার্কের ব্যাটে লেগে সরাসরি চলে যায় হরমনপ্রীত কৌরের হাতে—সেই বলটি আগামী বহু বছর ভারতীয় ক্রিকেটপ্রেমীরা স্মরণ করবে, কারণ সেটিই ছিল ভারতের বিশ্বকাপ জয়ের শেষ মুহূর্ত।
ভাইয়ের ত্যাগ ও এক প্রতিশ্রুতির গল্প
“আমি ক্রিকেট খেলতে শুরু করেছিলাম আমার ভাইয়ের জন্য,” দীপ্তি বলেন। “ও আমার জন্য অনেক কিছু ত্যাগ করেছে, এমনকি নিজের চাকরিটাও ছেড়ে দিয়েছিল। পরিবারের সামনে এমন মঞ্চে ভালো খেলে ট্রফি তোলা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় মুহূর্ত।” চোখে জল নিয়ে সুমিত বললেন, “আমি ভাগ্যবান যে আমার বোনের জন্য বিশ্বকাপ ট্রফি ছুঁতে পেরেছি, ভারতীয় পতাকা হাতে ছবি তুলতে পেরেছি। জীবনের স্মরণীয় মুহূর্ত এটা।”
দীপ্তির ভাই বলেন, “যখন চাকরি ছেড়েছিলাম, জানতাম না কখন দীপ্তি ভারতের হয়ে খেলবে, কত বছর খেলবে, আদৌ বিশ্বকাপে খেলবে কি না। শুধু জানতাম, আমি আমার সর্বোচ্চটা দেব যাতে সে ভারতের হয়ে খেলতে পারে। বাকিটা ঈশ্বর আমাদের কল্পনারও বাইরে পৌঁছে দিয়েছেন। যখন আপনি মন ও প্রাণ দিয়ে কোনও কিছু করেন, তখন ভাগ্যও আপনার পাশে থাকে।”
স্পিনে পথচলা
দীপ্তির ক্রিকেটযাত্রা শুরু হয়েছিল ছোটবেলায় ভাইয়ের ম্যাচে বল ছোড়া দিয়ে। ফিল্ডিংয়ের স্বাভাবিক দক্ষতার জন্য তিনি ছোটবেলা থেকেই নজর কাড়েন। সুমিতই তাঁকে মিডিয়াম পেস ছেড়ে স্পিন বোলিংয়ে মনোযোগ দিতে উৎসাহ দেন। কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ে দীপ্তি হয়ে উঠেছেন বিশ্বের সেরা অফ-স্পিনারদের একজন। এবারের বিশ্বকাপ শেষ করেছেন সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি হিসেবে। গত এক বছরে ব্যাটিংয়েও দারুণ উন্নতি ঘটেছে তাঁর, যার প্রমাণ—টুর্নামেন্টে তিনটি অর্ধশতক।
বিশ্বকাপের আগে আগ্রায় বাড়িতে বসে এক সাক্ষাৎকারে সুমিত বলেছিলেন, “যখন দীপ্তি উপরের ক্রমে ব্যাট করতে পারে, তখন ওর পক্ষে সেট হয়ে ম্যাচ টেনে নেওয়া সহজ হয়। নিচের দিকে নামলে সেটা কঠিন।” ফাইনালে পাঁচ নম্বরে নেমেই দীপ্তি করলেন সেই কাজ—অর্ধশতক হাঁকিয়ে, পাঁচটি উইকেট নিয়ে ইতিহাস গড়লেন তিনি।
তিনি হলেন আইসিসি নারী বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড়, যিনি একই ম্যাচে অর্ধশতক ও পাঁচ উইকেট নিয়েছেন।
এই অর্জন শুধু দীপ্তির নয়, বরং এক ভাইয়ের ত্যাগ, এক বোনের প্রতিজ্ঞা এবং এক পরিবারের স্বপ্নপূরণের গল্প।
