আধুনিক ফুটবলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নক্ষত্র কিলিয়ান এমবাপ্পের মাঠে বিচরণ এবং রক্ষণাত্মক কাজে তাঁর অনীহা নিয়ে ফুটবল বিশ্বে বিতর্কের শেষ নেই। রিয়াল মাদ্রিদ কিংবা ফ্রান্স জাতীয় দল—উভয় জায়গাতেই এমবাপ্পের ‘ওয়ার্ক রেট’ বা মাঠে কতটুকু দৌড়ান, তা নিয়ে প্রায়ই নেতিবাচক সংবাদ প্রকাশিত হয়। তবে এসব সমালোচনাকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন ফ্রান্সের বিশ্বকাপজয়ী কোচ দিদিয়ের দেশম। তাঁর মতে, এমবাপ্পে কেবল একজন খেলোয়াড় নন, বরং তিনি একজন ‘আসল অধিনায়ক’।
দৌড়ানোর পরিসংখ্যান বনাম কার্যকারিতা
সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে এমবাপ্পের অলসতা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে বেশ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান দেশম। তিনি স্পষ্ট করে বলেন যে, ফুটবল কেবল কিলোমিটার মাপার দৌড় প্রতিযোগিতা নয়। দেশমের ভাষায়, “আপনারা যদি আশা করেন এমবাপ্পে প্রতি ম্যাচে ১১ কিলোমিটার করে দৌড়াবে, তবে ভুল ভাবছেন। সে তা কখনোই করবে না এবং করার প্রয়োজনও নেই।”
দেশমের যুক্তি অনুযায়ী, একজন স্ট্রাইকারের মূল কাজ হলো প্রতিপক্ষের জালে বল জড়ানো। এমবাপ্পের মূল অস্ত্র হলো তাঁর গতি এবং বিস্ফোরক সক্ষমতা। যদি তিনি রক্ষণ সামলাতে মাঝমাঠের খেলোয়াড়দের মতো অবিরাম দৌড়ান, তবে গোলমুখে তাঁর সেই ধার থাকবে না। ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেওয়ার জন্য শক্তি সঞ্চয় করা একজন চতুর স্ট্রাইকারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
নিচে এমবাপ্পের খেলার ধরণ ও দেশমের দৃষ্টিভঙ্গির একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ দেওয়া হলো:
| বিষয়ের নাম | সমালোচকদের দাবি | দেশমের ব্যাখ্যা ও যুক্তি |
| মাঠের বিচরণ | এমবাপ্পে অলস এবং দৌড়াতে অনিচ্ছুক। | গতি ধরে রাখতে তিনি সচেতনভাবে শক্তি সঞ্চয় করেন। |
| রক্ষণাত্মক ভূমিকা | দলের প্রয়োজনে নিচে নেমে ডিফেন্স করেন না। | তাঁর শারীরিক গঠন ও খেলার ধরণ ডিফেন্ডারদের মতো নয়। |
| নেতৃত্বের গুণাবলি | ব্যক্তিচিন্তা ও অহংকারী মনোভাব ফুটে ওঠে। | দলের তরুণ খেলোয়াড়দের কাছে তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয় ও আদর্শ। |
| খেলার ধরণ | বেশি স্বার্থপর এবং একক ভাবে গোল করতে চান। | স্ট্রাইকার হিসেবে গোলমুখে কিছুটা ব্যক্তিগত হওয়া জরুরি। |
| দলের ওপর প্রভাব | তাঁর কারণে দলের ট্যাকটিক্যাল ভারসাম্য নষ্ট হয়। | তিনি এমন একজন খেলোয়াড় যার জন্য কৌশলে ছাড় দেওয়া যায়। |
ব্যক্তিত্ব ও দলের ভেতরে অবস্থান
মাঠের বাইরের এমবাপ্পেকে নিয়ে গণমাধ্যমে প্রায়ই একটি ‘অহংকারী’ বা ‘স্বার্থপর’ ভাবমূর্তি ফুটে ওঠে। কিন্তু দেশমের পর্যবেক্ষণ সম্পূর্ণ ভিন্ন। পিএসজির সাবেক এই ফরোয়ার্ডের সাথে জাতীয় দলের তরুণ ফুটবলারদের রসায়ন চমৎকার। দেশম নিশ্চিত করেছেন যে, দলের ভেতরে এমবাপ্পে অত্যন্ত অমায়িক এবং বড় ভাইয়ের মতো নেতৃত্ব দেন।
দেশমের মতে, বাইরের মানুষেরা তাঁকে কীভাবে দেখছে তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ড্রেসিংরুমে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা। আর সেখানে এমবাপ্পে একজন সত্যিকারের নেতার মতোই আচরণ করেন। তিনি দলের স্বার্থকে সবার উপরে রাখেন এবং তরুণদের মানসিকভাবে চাঙ্গা করতে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন।
কোচ দেশমের আস্থার কারণ
২০১৮ বিশ্বকাপ জয়ী এই কোচ মনে করেন, পরিসংখ্যান দিয়ে সবসময় খেলোয়াড়ের প্রভাব বোঝা যায় না। একজন খেলোয়াড় ৯ কিলোমিটার দৌড়ে যদি তিনটি গোল করেন, তবে সেটি ১১ কিলোমিটার দৌড়ে গোলহীন থাকার চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর। এমবাপ্পে সেই শ্রেণীর খেলোয়াড় যারা ৯ সেকেন্ডের জাদুকরী গতির মাধ্যমে ম্যাচের ফলাফল নির্ধারণ করে দিতে পারেন।
সবশেষে দেশম এই বার্তাই দিতে চেয়েছেন যে, এমবাপ্পের মতো বিরল প্রতিভাকে ব্যবহার করতে হলে তাঁর কিছু সীমাবদ্ধতা মেনে নিতেই হবে। সমালোচনা সত্ত্বেও দেশমের ফ্রান্স দলে এমবাপ্পের স্থান এবং মর্যাদা যে অবিচ্ছেদ্য, তা তিনি পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
