বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসের গত দুই দশকের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব এবং জাতীয় দলের সাবেক সফল অধিনায়ক মামুনুল ইসলাম তাঁর বর্ণাঢ্য পেশাদার ফুটবল ক্যারিয়ারের চূড়ান্ত সমাপ্তি টানার ঘোষণা দিয়েছেন। আগামী শুক্রবার, ১ মে ২০২৬ তারিখে রাজধানীর বসুন্ধরা কিংস অ্যারেনায় রহমতগঞ্জ মুসলিম ফ্রেন্ডস অ্যান্ড সোসাইটির বিপক্ষে ফর্টিস এফসির হয়ে মাঠে নামার মাধ্যমে তিনি নিজের দীর্ঘ ফুটবল যাত্রার ইতি টানবেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বার্তায় এই অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার নিশ্চিত করেছেন যে, ঘরোয়া লিগের এই ম্যাচটিই হতে যাচ্ছে তাঁর ক্যারিয়ারের ‘লাস্ট ড্যান্স’। ৩৭ বছর বয়সী এই ফুটবলার তাঁর বিদায়ী মুহূর্তে ভক্ত ও সমর্থকদের মাঠে উপস্থিত থেকে তাঁকে সাহস যোগানোর বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছেন।
Table of Contents
জাতীয় দলের ‘অঘোষিত সেনাপতি’ ও নেতৃত্বের এক যুগ
মামুনুল ইসলাম কেবল একজন খেলোয়াড় হিসেবেই নয়, বরং মাঠের ভেতরে ও বাইরে একজন দক্ষ সংগঠক এবং অনুপ্রেরণাদায়ী নেতা হিসেবে বাংলাদেশের ফুটবলে নিজের নাম খোদাই করে নিয়েছেন। ২০০৭ সালে জাতীয় দলে অভিষেকের পর থেকে দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় তিনি ছিলেন লাল-সবুজ পতাকার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান: জাতীয় দলের হয়ে তিনি মোট ৫৯টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন, যেখানে মাঝমাঠ থেকে খেলা নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি ৩টি দর্শনীয় গোল উপহার দিয়েছেন।
নেতৃত্বের উত্তরাধিকার: ২০১৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত তিনি জাতীয় দলের অধিনায়কত্ব করেছেন। তাঁর সময়েই বাংলাদেশ ফুটবল দল নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখেছিল এবং এশিয়ান গেমসের মতো বড় মঞ্চে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ফুটবল খেলেছিল।
কলাকৌশল ও দক্ষতা: মাঠে নিখুঁত পাসের পসরা সাজানো এবং দূরপাল্লার কামানদাগা শটের জন্য তিনি ফুটবল প্রেমীদের কাছে ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয়। বিশেষ করে ফ্রি-কিক এবং কর্নার থেকে তাঁর বাঁ-পায়ের জাদুকরী বাঁক নেওয়ার ক্ষমতার কারণে তাঁকে দেশের সেরা ‘ডেড বল স্পেশালিস্ট’ বলা হতো।
মাঠ থেকে জাতীয় দলকে বিদায় জানানোর ইচ্ছা থাকলেও নানা প্রশাসনিক ও পারিপার্শ্বিক কারণে তা সম্ভব হয়নি। তবে দেশের শীর্ষ লিগের ম্যাচ দিয়ে মাঠ থেকেই বুটজোড়া তুলে রাখতে পারাকেই তিনি পরম তৃপ্তি হিসেবে দেখছেন।
ঘরোয়া ক্লাব ফুটবলে শিরোপার কারিগর
বাংলাদেশের ঘরোয়া ফুটবলের ইতিহাসে মামুনুল ইসলাম মানেই ছিল ‘সাফল্যের নিশ্চয়তা’। আবাহনী-মোহামেডান থেকে শুরু করে আধুনিক ক্লাব ফুটবল—সব জায়গাতেই তাঁর পদচারণা ছিল রাজকীয়:
সবুজ গালিচার রাজা: তিনি ঢাকা আবাহনী লিমিটেড, ঢাকা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব, শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্র এবং শেখ জামাল ধানমণ্ডি ক্লাবের মতো দেশের প্রতিটি বড় ক্লাবের হয়ে মাঠ মাতিয়েছেন।
শিরোপার জয়গান: মামুনুল তাঁর ক্যারিয়ারে প্রায় প্রতিটি ক্লাবের হয়েই বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল), ফেডারেশন কাপ এবং স্বাধীনতা কাপের শিরোপা জয়ের গৌরব অর্জন করেছেন।
ফর্টিস এফসির শেষ যাত্রা: ক্যারিয়ারের গোধূলি বেলায় তিনি ফর্টিস এফসিতে যোগ দিয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা সতীর্থদের মাঝে বিলিয়ে দিয়েছেন এবং এই ক্লাবের জার্সি গায়েই তিনি ১ মে তাঁর বিদায়ী ম্যাচটি খেলবেন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলার দূত: আইএসএল মিশন
মামুনুল ইসলামের ফুটবল ক্যারিয়ারের সবচেয়ে অনন্য অর্জনটি হলো ভারতের অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক এবং ব্যয়বহুল লিগ ‘ইন্ডিয়ান সুপার লিগ’ (আইএসএল)-এ অংশগ্রহণ।
২০১৪ সালে তিনি আইএসএল-এর অন্যতম শক্তিশালী ফ্র্যাঞ্চাইজি আতলেতিকো ডি কলকাতা-তে নাম লিখিয়ে ইতিহাস গড়েন। তিনি ছিলেন প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র বাংলাদেশি ফুটবলার, যিনি এই মেগা ইভেন্টের অংশ হতে পেরেছিলেন। সেখানে তিনি চ্যাম্পিয়ন দলের সদস্য হওয়ার পাশাপাশি বিশ্বখ্যাত স্প্যানিশ ফুটবলার লুইস গার্সিয়া এবং কোচ আন্তোনিও লোপেজ হাবাসের সাথে কাজ করার বিরল অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।
যদিও চোটের কারণে সেখানে নিয়মিত মাঠে নামা হয়নি, তবে তাঁর সেই যাত্রা বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্রে বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের ব্র্যান্ড ভ্যালু কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।
ফুটবল পরবর্তী ভবিষ্যৎ ও কিংবদন্তির প্রতি শ্রদ্ধা
১ মে’র বিকেলটি কেবল একটি ফুটবল ম্যাচ নয়, বরং এটি বাংলাদেশের ফুটবলের একটি সমৃদ্ধ প্রজন্মের বিদায় মুহূর্ত। মামুনুল তাঁর বিদায়ী বার্তায় স্বীকার করেছেন যে, দীর্ঘ ২০ বছরের এই কণ্টকাকীর্ণ পথে ভক্তদের নিঃস্বার্থ ভালোবাসাই ছিল তাঁর একমাত্র চালিকাশক্তি।
পেশাদার খেলা ছেড়ে দেওয়ার পর তিনি সরাসরি কোচিংয়ে আসবেন কি না, তা নিয়ে এখনো স্পষ্ট কিছু জানাননি। তবে ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, মামুনুল ইসলামের মতো তীক্ষ্ণ ফুটবল মস্তিষ্ক সম্পন্ন একজন ব্যক্তিত্ব যদি বাফুফে বা দেশের তৃণমূল পর্যায়ের একাডেমিগুলোর সাথে যুক্ত হন, তবে তা ফুটবলের আধুনিকায়নে বড় ভূমিকা রাখবে।
পরিশেষে বলা যায়, বসুন্ধরা কিংস অ্যারেনার সবুজ ঘাসে ১ মে রহমতগঞ্জ বনাম ফর্টিস এফসির লড়াই ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠবে ‘মামুনুল ইসলাম’ নামটি। বাংলাদেশের ফুটবলের এক কিংবদন্তিকে যথোচিত সম্মান ও বীরোচিত বিদায় জানানোর মাধ্যমে একটি বর্ণাঢ্য অধ্যায়ের অবসান ঘটবে।
