হ্যাটট্রিক শিরোপার অন্বেষণে গোয়া যাত্রায় বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল

দক্ষিণ এশিয়ার নারী ফুটবলের সর্বোচ্চ আসর ‘সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপ’-এ নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব অক্ষুণ্ণ রাখার এক কঠিন চ্যালেঞ্জ নিয়ে নতুন পথচলা শুরু করছে বাংলাদেশ। টানা দুইবারের চ্যাম্পিয়ন হিসেবে এবার বাংলাদেশের লক্ষ্য হ্যাটট্রিক শিরোপা জয়। এই রাজকীয় মিশন সামনে রেখে আগামীকাল থাইল্যান্ডের ব্যাংককের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করবে বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দল। সেখানে ১৫ দিনের এক নিবিড় কন্ডিশনিং ক্যাম্প এবং প্রস্তুতি ম্যাচ শেষে সরাসরি ভারতের গোয়ায় পৌঁছাবে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা। এবারের অভিযানে অভিজ্ঞতার চেয়ে শৃঙ্খলা এবং তারুণ্যের তেজকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে টিম ম্যানেজমেন্ট।

কঠোর শৃঙ্খলা ও স্কোয়াডে বড় বিবর্তন

সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপ ২০২৪-এর জন্য ঘোষিত ২৩ সদস্যের স্কোয়াডটি দেশের ফুটবল অঙ্গনে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের নিয়মিত এবং অভিজ্ঞ দুই ফুটবলার স্বপ্না রানী ও মুনকি আক্তারের বাদ পড়া। কোচ পিটার বাটলারের এই সিদ্ধান্তকে ফুটবল বিশ্লেষকরা শৃঙ্খলার প্রশ্নে এক ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি হিসেবে দেখছেন।

রোববার বাফুফে ভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কোচ বাটলার অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তাঁর অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। তিনি জানান, মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি দলের প্রতি খেলোয়াড়দের নিবেদন এবং শৃঙ্খলাবোধ তাঁর কাছে অগ্রাধিকার পায়। তিনি বলেন, স্বপ্না ও মুনকি বর্তমানে কাঙ্ক্ষিত ছন্দে নেই এবং কৌশলগত নির্দেশনার প্রতি তাঁদের উদাসীনতা ও অপেশাদার আচরণ পরিলক্ষিত হয়েছে। খেলোয়াড়দের পেশাদারিত্ব সম্পর্কে সচেতন করতে এবং দীর্ঘমেয়াদী সুফল পেতে তাঁদের মূল দলের অনুশীলনের বাইরে রাখা হয়েছে। এই কঠোর বার্তাটি দলের অন্য খেলোয়াড়দের জন্যও এক সতর্ক সংকেত হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করা হচ্ছে।

ভারতের মাটিতে বৈরী পরিবেশ ও প্রতিপক্ষের চ্যালেঞ্জ

অষ্টম সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপ আগামী ২৫ মে ভারতের গোয়ায় শুরু হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ গত দুই আসরে নেপালের প্রতিকূল পরিবেশে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করলেও এবার লড়াইটা হবে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের ঘরের মাঠে। দক্ষিণ এশিয়ায় নারী ফুটবলের ইতিহাসে ভারত সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ, যারা এ পর্যন্ত পাঁচবার শিরোপা জিতেছে। নিজ দেশের কন্ডিশন এবং দর্শকদের সমর্থনে ভারত এবার শিরোপা পুনরুদ্ধারে মরিয়া হয়ে মাঠে নামবে।

কোচ পিটার বাটলার ও নতুন অধিনায়ক আফঈদা খন্দকার আসন্ন টুর্নামেন্টের কঠিন বাস্তবতা সম্পর্কে সম্যক সচেতন। সংবাদ সম্মেলনে বাটলার মনে করিয়ে দেন যে, ভারত ছাড়াও নেপাল এবং ভুটানের মতো দলগুলো এখন টেকনিক্যাল এবং ফিজিক্যাল দিক থেকে অভাবনীয় উন্নতি করেছে। প্রতিটি দলই এখন ট্যাকটিক্যালি অনেক বেশি সংবদ্ধ, যা বাংলাদেশের হ্যাটট্রিক শিরোপার পথকে বিগত বছরের তুলনায় অনেক বেশি কণ্টকাকীর্ণ করে তুলবে।

ব্যাংকক ক্যাম্প ও কৌশলগত প্রস্তুতি

গোয়ার গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ার সাথে মানিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে ১৫ দিনের কন্ডিশনিং ক্যাম্পটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সূচি অনুযায়ী, ব্যাংককে অবস্থানকালে ১০ ও ১৭ মে দুটি শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে প্রস্তুতি ম্যাচ খেলবে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। অভিজ্ঞ ফুটবলারদের অনুপস্থিতিতে এই ম্যাচগুলো হবে তরুণ খেলোয়াড়দের জন্য নিজেদের প্রমাণের বড় মঞ্চ। কোচ বাটলারের জন্য এটি একটি নতুন দলীয় রসায়ন বা ‘কম্বিনেশন’ তৈরি করার সুযোগ। এরপর ২১ মে সরাসরি থাইল্যান্ড থেকে ভারতের গোয়ায় অবতরণ করবে দলটি।

তারুণ্যনির্ভর স্কোয়াড ও অভিজ্ঞদের অনুপস্থিতি

২০২৪ সালের এই সাফ মিশনে বাংলাদেশ দলে এক ঐতিহাসিক বিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গত আসরের নিয়মিত স্কোয়াডের ১০ জন ফুটবলার এবার মূল তালিকায় নেই। দলের দীর্ঘদিনের স্তম্ভ ও অধিনায়ক সাবিনা খাতুন, স্ট্রাইকার কৃষ্ণা রানী সরকার, মিডফিল্ডার সানজিদা আক্তার এবং ডিফেন্ডার মাসুরা পারভীনের মতো সিনিয়র খেলোয়াড়রা বিভিন্ন কারণে স্কোয়াডের বাইরে রয়েছেন। ইনজুরির কারণে দলের রক্ষণভাগ থেকে ছিটকে গেছেন অভিজ্ঞ নবীরন খাতুন।

অভিজ্ঞদের এই বিশাল শূন্যতা পূরণে কোচ বাটলার একঝাঁক প্রতিভাবান তরুণীর ওপর আস্থা রেখেছেন। প্রথমবারের মতো জাতীয় দলে ডাক পেয়েছেন স্বর্ণা রানী, হালিমা খাতুন ও সুরভী আকন্দ প্রীতি। এছাড়া সম্পূর্ণ নতুন মুখ হিসেবে সুযোগ পেয়েছেন অর্পিতা বিশ্বাস ও মোমিতা খাতুন। তারুণ্যের এই জয়গানই হবে এবারের আসরে বাংলাদেশের প্রধান অস্ত্র।

চূড়ান্ত ২৩ সদস্যের বাংলাদেশ স্কোয়াড

পজিশনখেলোয়াড়দের নাম
গোলরক্ষকরুপনা চাকমা, মিলি আক্তার।
রক্ষণভাগশিউলি আজিম, আফঈদা খন্দকার (অধিনায়ক), সুরমা জান্নাত, কোহাতি কিসকু, উন্নতি খাতুন, অর্পিতা বিশ্বাস।
মধ্যভাগমারিয়া মান্দা, মনিকা চাকমা, শাহেদা আক্তার রিপা, ঋতুপর্ণা চাকমা, হালিমা আক্তার, মোমিতা খাতুন, আনিকা রানী সিদ্দিকী।
আক্রমণভাগশামসুন্নাহার সিনিয়র, শামসুন্নাহার জুনিয়র, সুরভী আকন্দ প্রীতি, উমেহ্লা মারমা, মোছাম্মৎ সাগরিকা, তহুরা খাতুন, স্বর্ণা রানী মন্ডল।

শৃঙ্খলার কড়াকড়ি এবং তারুণ্যের অফুরন্ত প্রাণশক্তি নিয়ে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল তাদের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখতে কতটা সফল হয়, তা দেখার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে দেশবাসী। ভারতের গোয়ায় এই নতুন স্কোয়াডটিই লাল-সবুজের সম্মান রক্ষায় লড়বে।

Leave a Comment