যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিতব্য ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপকে ঘিরে চরম তাপমাত্রাজনিত ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছেন একদল আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানী। তাদের গবেষণায় বলা হয়েছে, টুর্নামেন্টের জন্য নির্ধারিত ১৬টি স্টেডিয়ামের মধ্যে ১৪টিতেই খেলোয়াড়দের জন্য উচ্চ তাপমাত্রাজনিত ঝুঁকি বিদ্যমান থাকতে পারে। বিশেষ করে মেক্সিকো এবং যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলে অনুষ্ঠিত ম্যাচগুলোতে তাপমাত্রা প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
গবেষক দলটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, শুধুমাত্র তাপমাত্রা নয়, আর্দ্রতা, সূর্যের তীব্রতা এবং বাতাসের গতিও মিলিতভাবে খেলোয়াড়দের শারীরিক অবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এসব পরিবেশগত উপাদান একসঙ্গে শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে, যা মাঠে খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি উভয়ই বাড়াতে পারে।
বিজ্ঞানীরা আরও উল্লেখ করেছেন, পূর্বে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত ক্লাব বিশ্বকাপের সময়ও একই ধরনের আবহাওয়াজনিত সমস্যা দেখা গিয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আসন্ন বিশ্বকাপে দক্ষিণাঞ্চলীয় ভেন্যুগুলোতে গড় তাপমাত্রা ৩০ থেকে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকার সম্ভাবনা থাকলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে তা ৪০ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এই চরম আবহাওয়া পরিস্থিতি মোকাবেলায় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা ইতোমধ্যে কিছু ব্যবস্থা গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে। প্রতিটি ম্যাচের দুই অর্ধে বাধ্যতামূলকভাবে তিন মিনিটের ‘কুলিং ব্রেক’ রাখা হবে। পাশাপাশি খেলোয়াড় ও টেকনিক্যাল স্টাফদের জন্য জলবায়ু নিয়ন্ত্রিত বেঞ্চের ব্যবস্থাও থাকবে। তাপমাত্রা নির্ধারণ ও ঝুঁকি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘ওয়েট বাল্ব গ্লোব টেম্পারেচার’ সূচক ব্যবহার করা হচ্ছে, যা আর্দ্রতা, তাপমাত্রা এবং সূর্যালোকের সম্মিলিত প্রভাব পরিমাপ করে।
তবে ২০ সদস্যের এই আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানী দল মনে করছে, ফিফার বর্তমান পদক্ষেপগুলো খেলোয়াড়দের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট নয়। তাদের মতে, মাঠের তাপমাত্রা ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করলে ম্যাচ স্থগিত বা পুনঃনির্ধারণের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় আনা প্রয়োজন।
এছাড়া তারা কুলিং ব্রেকের বর্তমান সময়সীমা তিন মিনিট থেকে বাড়িয়ে অন্তত ছয় মিনিট করার সুপারিশ করেছে। গবেষকদের মতে, অতিরিক্ত সময় খেলোয়াড়দের শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং শারীরিক পুনরুদ্ধারে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
বিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিশ্বকাপের মতো দীর্ঘমেয়াদি ও উচ্চ প্রতিযোগিতামূলক টুর্নামেন্টে আবহাওয়াজনিত চাপ শুধু খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্যেই নয়, ম্যাচের গতি ও মানের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। ধারাবাহিকভাবে উচ্চ তাপমাত্রার মধ্যে খেলা চললে শারীরিক ক্লান্তি ও পানিশূন্যতার ঝুঁকি বাড়ে, যা সামগ্রিক পারফরম্যান্সকে প্রভাবিত করতে পারে।
তিনটি ভিন্ন দেশের বিস্তৃত ভৌগোলিক অঞ্চলে আয়োজিত এই বিশ্বকাপে বিভিন্ন ভেন্যুর আবহাওয়ার মধ্যে পার্থক্য থাকবে। কিছু ভেন্যুতে গ্রীষ্মকালীন তাপমাত্রা তুলনামূলকভাবে বেশি থাকায় ঝুঁকির মাত্রাও ভিন্ন হবে। এই পরিস্থিতিতে আয়োজক সংস্থা ও নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের জন্য আবহাওয়াজনিত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
গবেষক দলটি মনে করে, ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসরগুলোতে আবহাওয়া-সম্পর্কিত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন, যাতে খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং প্রতিযোগিতার মান উভয়ই নিশ্চিত করা যায়।
