ডুলির সামনে বাংলাদেশের কঠিন চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের নতুন প্রধান কোচ হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক বিশ্বকাপ ফুটবলার টমাস ডুলি। দীর্ঘ জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ৬৫ বছর বয়সী জার্মান বংশোদ্ভূত এই কোচ আজ সকালে ঢাকায় পৌঁছেছেন। পরে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর নিয়োগের ঘোষণা দেয়। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী রোববার থেকেই জাতীয় দলের অনুশীলন ক্যাম্পে যোগ দেবেন তিনি।

বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে বিদেশি কোচদের ভূমিকা সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে এসেছে। কেউ দলকে আন্তর্জাতিক সাফল্য এনে দিয়েছেন, কেউ আবার অল্প সময়ের মধ্যেই হতাশ হয়ে দায়িত্ব ছেড়েছেন। প্রায় পাঁচ দশকের সেই ধারাবাহিকতায় নতুন সংযোজন টমাস ডুলি।

বাংলাদেশ জাতীয় দলে বিদেশি কোচ নিয়োগের ইতিহাস শুরু হয় ১৯৭৮ সালে। তৎকালীন পশ্চিম জার্মানির ওয়ার্নার বেকেল হপ্ট ছিলেন প্রথম বিদেশি কোচ। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের ফুটবল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান তৈরি করার চেষ্টা করছিল। ১৯৭৩ সালে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার পর ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিয়মিত অংশ নিতে শুরু করে বাংলাদেশ। সে সময় বিদেশি কোচ নিয়োগ ছিল মূলত পরীক্ষামূলক উদ্যোগ, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ নয়।

তবে সময়ের সঙ্গে কয়েকজন বিদেশি কোচ বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে স্থায়ীভাবে জায়গা করে নিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম জার্মান কোচ অটো ফিস্টার। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে তাঁর অধীনেই বাংলাদেশ মিয়ানমারে অনুষ্ঠিত চার জাতির টাইগার ট্রফি জেতে, যা ছিল দেশের প্রথম আন্তর্জাতিক ফুটবল শিরোপা। সে সময়ের ফুটবলাররা প্রায়ই উল্লেখ করেন, ফিস্টার তাঁদের আন্তর্জাতিক ফুটবলে পেশাদার মানসিকতার গুরুত্ব শিখিয়েছিলেন।

এরপর ইরাকের সামির শাকেরের অধীনে বাংলাদেশ ১৯৯৯ দক্ষিণ এশিয়ান গেমসে ফুটবলে স্বর্ণপদক জেতে। দলটির শৃঙ্খলা, আত্মবিশ্বাস ও লড়াকু মানসিকতা সেই সময় বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছিল। তবে তাঁর বিদায় ছিল বিতর্কিত ও নীরব। স্বর্ণ জয়ের পর তিনি কাঠমান্ডু থেকে নিভৃতে দেশ ছাড়েন।

বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অর্জনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অস্ট্রিয়ান কোচ জর্জ কোটানের নাম। তাঁর অধীনেই বাংলাদেশ ২০০৩ সালে প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জেতে। ঢাকার জাতীয় স্টেডিয়ামে টাইব্রেকারে মালদ্বীপকে হারিয়ে ট্রফি জয়ের সেই মুহূর্ত এখনো দেশের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়।

নিচে বাংলাদেশের ফুটবলে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন বিদেশি কোচ ও তাঁদের সাফল্যের সংক্ষিপ্ত তথ্য তুলে ধরা হলো—

কোচের নামদেশউল্লেখযোগ্য সাফল্য
ওয়ার্নার বেকেল হপ্টপশ্চিম জার্মানিবাংলাদেশের প্রথম বিদেশি কোচ
অটো ফিস্টারজার্মানিটাইগার ট্রফি জয়
সামির শাকেরইরাক১৯৯৯ দক্ষিণ এশিয়ান গেমসে স্বর্ণ
জর্জ কোটানঅস্ট্রিয়া২০০৩ সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জয়
জোরান জর্জেভিচসার্বিয়া২০১০ এসএ গেমসে স্বর্ণ
জেমি ডেইংল্যান্ড২০১৮ এশিয়ান গেমসে শেষ ষোলো
হাভিয়ের কাবরেরাস্পেনদীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ব পালন

পরবর্তী সময়ে অনেক বিদেশি কোচ বাংলাদেশে এলেও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রাখতে পারেননি। ইতালির ফাবিও লোপেজ, বেলজিয়ামের টম সেইন্টফিট, স্পেনের গনজালো মোরেনো, অ্যানড্রু অর্ড কিংবা সার্বিয়ার জোরান জর্জেভিচ—অনেকেই স্বল্প সময় দায়িত্ব পালন করেছেন। কেউ খেলোয়াড়দের মান নিয়ে হতাশ হয়েছেন, কেউ প্রশাসনিক জটিলতায় বিরক্ত হয়েছেন।

ইংল্যান্ডের জেমি ডে তুলনামূলক দীর্ঘ সময় দায়িত্বে ছিলেন। তাঁর সময়েই বাংলাদেশ ২০১৮ এশিয়ান গেমসে কাতারকে হারিয়ে এবং থাইল্যান্ডের সঙ্গে ড্র করে প্রথমবারের মতো শেষ ষোলোতে ওঠে। অন্যদিকে স্প্যানিশ কোচ হাভিয়ের কাবরেরা প্রায় ৫২ মাস দায়িত্ব পালন করেন, যা বাংলাদেশের ফুটবলে বিরল ঘটনা। তাঁর সময়েই ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে খেলা হামজা চৌধুরী জাতীয় দলে যোগ দেন। তবে বড় কোনো শিরোপা আসেনি।

নতুন কোচ টমাস ডুলির আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা উল্লেখযোগ্য। খেলোয়াড়ি জীবনে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে ৮১টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র দলের সদস্য ছিলেন এবং ১৯৯৮ বিশ্বকাপে দলকে নেতৃত্ব দেন। ক্লাব পর্যায়ে খেলেছেন বায়ার লেভারকুসেন, শালকে ও কাইজারস্লাউটার্নের মতো ক্লাবে। শালকের হয়ে উয়েফা কাপ এবং কাইজারস্লাউটার্নের হয়ে বুন্দেসলিগা জয়ের অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর।

কোচ হিসেবেও তিনি বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় দলে ইয়ুর্গেন ক্লিন্সম্যানের সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ফিলিপাইন জাতীয় দলকে প্রথমবার এশিয়ান কাপে তুলেছিলেন তিনি। এছাড়া ভিয়েতনামের ক্লাব ফুটবলেও স্পোর্টিং ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করেছেন। সর্বশেষ ছিলেন গায়ানা জাতীয় দলের দায়িত্বে।

তবে বাংলাদেশের ফুটবলের বাস্তবতা জটিল। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, দুর্বল ঘরোয়া লিগ, বয়সভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনার ঘাটতি এবং প্রশাসনিক অস্থিরতা দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত সমস্যা। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক মানের স্ট্রাইকারের অভাবও জাতীয় দলের অন্যতম বড় সীমাবদ্ধতা হিসেবে বিবেচিত হয়।

এই বাস্তবতায় টমাস ডুলির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে দেশের ফুটবল কাঠামো ও সংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং বিদ্যমান সীমাবদ্ধতার মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক দল গড়ে তোলা। বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাস বলছে, বিদেশি কোচরা কখনো সাফল্যের নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছেন, আবার অনেকেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি। এখন দেখার বিষয়, টমাস ডুলি সেই ইতিহাসে কোন অধ্যায়টি লিখতে পারেন।

Leave a Comment