বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের নতুন প্রধান কোচ হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন জার্মান বংশোদ্ভূত আমেরিকান কোচ টমাস ডুলি। হাভিয়ের কাবরেরার অধ্যায়ের পর জাতীয় দলের দায়িত্বে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে তার মাধ্যমে। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) গতকাল ডুলিকে দুই বছরের জন্য জাতীয় দলের প্রধান কোচ হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ঘোষণা দেয়।
নতুন কোচকে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় ‘কুল-বিএসপিএ স্পোর্টস অ্যাওয়ার্ড’ অনুষ্ঠানে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাফুফের সভাপতি তাবিথ আউয়াল। সেখানে বাংলাদেশের ফুটবল নিয়ে নিজের পরিকল্পনা, দর্শন এবং ভবিষ্যৎ লক্ষ্য তুলে ধরেন ডুলি।
বাংলাদেশ দলের বর্তমান অবস্থা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ডুলি জানান, তার প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে ফিফা র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থানের উন্নতি ঘটানো। তিনি বলেন, “আমার লক্ষ্য হলো র্যাংকিংয়ে ১৬০ বা ১৫০-এর মধ্যে চলে আসা।”
তবে এই লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে না বলেও স্পষ্ট করেন নতুন কোচ। তার মতে, আন্তর্জাতিক ফুটবলে একটি দলকে প্রতিযোগিতামূলক পর্যায়ে নিয়ে যেতে সময়, ধারাবাহিকতা এবং সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার প্রয়োজন হয়। তিনি বলেন, “এটা রাতারাতি হবে না। এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া।”
ডুলি নিজের ফুটবল দর্শনের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, তিনি দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় বিশ্বাসী। এ সময় তিনি তার লেখা বই ‘দ্য ট্রুথ অ্যাবাউট সাকসেস ইন সকার দ্যাট নো ওয়ান টিচেস’-এর কথাও উল্লেখ করেন। বইটিতে ফুটবলে সাফল্যের জন্য চারটি মূল স্তম্ভের কথা বলা হয়েছে বলে জানান তিনি। এর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে মানসিকতা বা মেন্টালিটি।
বাংলাদেশ দলের জন্য বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণের বিষয়েও কথা বলেন ডুলি। তার মতে, শুধু র্যাংকিং নয়, মাঠের খেলায়ও ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হবে। তিনি এমন একটি দল গড়ে তুলতে চান, যারা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবে এবং নিজেদের ফুটবল দিয়ে নজর কাড়বে।
ডুলির ভাষায়, “বাস্তবসম্মত লক্ষ্য হলো দলটিকে এমন একটি অবস্থানে নিয়ে যাওয়া যাতে তারা আরও বেশি নজর কাড়তে পারে এবং সুন্দর ফুটবল খেলতে পারে।”
নিজের কৌশলগত দর্শন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, তিনি এমন ফুটবল পছন্দ করেন যেখানে দল বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কাছে রাখবে। তার মতে, সারাক্ষণ প্রতিপক্ষের পেছনে ছুটে বল পুনরুদ্ধারের চেয়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে খেলা পরিচালনা করা বেশি কার্যকর।
ডুলি বলেন, “আমি ফুটবল খেলতে পছন্দ করি, বলের পেছনে দৌড়াতে পছন্দ করি না। আমি আমার খেলোয়াড়দেরও এটাই বলছি। বল তাড়া করা জিনিসটা আমি পছন্দ করি না। কারণ তখন আপনাকে শুধু শুধুই দৌড়াতে হয় বলটি ফিরে পাওয়ার জন্য, আর অধিকাংশ সময় আপনি বল ফেরতও পান না।”
তিনি আরও বলেন, “আমি ফুটবল পায়ে রেখে খেলতে পছন্দ করি। আর আমি খেলোয়াড়দের অনুপ্রাণিত করতে চাই, কারণ কোনো কিছু পেতে হলে আপনাকে পরিশ্রম করতে হবে।”
টমাস ডুলি যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় দলের সাবেক মিডফিল্ডার। খেলোয়াড়ি জীবনে তিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খেলার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। পরবর্তীতে কোচিং পেশায় যুক্ত হয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করেছেন। বাংলাদেশ জাতীয় দলের দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলে নতুন অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছেন তিনি।
বর্তমানে বাংলাদেশ ফুটবল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান শক্তিশালী করার চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধারাবাহিক সাফল্যের অভাব এবং র্যাংকিংয়ে পিছিয়ে পড়া নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে নতুন কোচের অধীনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, খেলোয়াড় উন্নয়ন এবং কৌশলগত পরিবর্তনের দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে বাফুফে।
ডুলির বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, তিনি তাৎক্ষণিক ফলের চেয়ে ধাপে ধাপে উন্নয়নের পথে এগোতে চান। র্যাংকিংয়ের উন্নতি, বল নিয়ন্ত্রণভিত্তিক ফুটবল এবং খেলোয়াড়দের মানসিক প্রস্তুতির ওপর জোর দিয়েই বাংলাদেশ ফুটবলে নিজের যাত্রা শুরু করছেন নতুন এই কোচ।
