বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রতিটি আসরেই অন্যতম প্রধান দাবিদার বা ফেভারিট দল হিসেবে মাঠে নামে ব্রাজিল। তবে তাদের বহুল প্রতীক্ষিত ষষ্ঠ বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ের মিশনটি দীর্ঘ চব্বিশ বছর ধরে অধরাই রয়ে গেছে। সর্বশেষ ২০০২ সালে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর তারা কেবল একবারই, তথা ২০১৪ সালের ঘরোয়া বিশ্বকাপে সেমিফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছিল। আগামী ফুটবল বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে ব্রাজিল দলকে নিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের মাঝে উদ্দীপনার কোনো কমতি নেই। ফুটবল বিশ্ব যখন দলগুলোর মাঠের লড়াইয়ের সমীকরণ মেলাতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই এক জার্মান অর্থনীতিবিদের করা একটি চাঞ্চল্যকর ভবিষ্যদ্বাণী ফুটবল ভক্তদের মাঝে, বিশেষ করে ব্রাজিল সমর্থকদের মধ্যে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
ইওয়াখিম ক্লেমেন্টের গাণিতিক মডেল ও ব্রাজিলের বিদায়
জার্মান বিনিয়োগ বিশ্লেষক এবং অর্থনীতিবিদ ইওয়াখিম ক্লেমেন্ট একটি বিশেষ গাণিতিক মডেল ও সুনির্দিষ্ট অ্যালগরিদমের মাধ্যমে আসন্ন বিশ্বকাপের দলগুলোর ভাগ্য নির্ধারণের চেষ্টা করেছেন। তার এই বিশেষ গাণিতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল এবার গ্রুপ পর্বের বাধা অতিক্রম করতে পারলেও নকআউট পর্বের প্রথম ধাপেই, অর্থাৎ সেরা বত্রিশের রাউন্ড থেকেই বিদায় নেবে। অন্যদিকে, ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম দুর্ভাগ্যবশত রানার্স-আপ বা ‘চোকার্স’ হিসেবে পরিচিত নেদারল্যান্ডস এবার তাদের ফুটবল ইতিহাসের সর্বপ্রথম বিশ্বকাপ ট্রফিটি ঘরে তুলবে।
ক্লেমেন্টের এই গাণিতিক ভবিষ্যদ্বাণীকে ফুটবল বিশ্ব একেবারে উড়িয়ে দিতে পারছে না। এর প্রধান কারণ হলো, তিনি এর আগে টানা তিনটি ফুটবল বিশ্বকাপের চূড়ান্ত বিজয়ীর নাম একদম নিখুঁতভাবে গণনা করে দেখিয়েছেন। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে তিনি জার্মানির চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কথা বলেছিলেন, যা সত্য প্রমাণিত হয়। এরপর ২০১৮ সালের বিশ্বকাপে তার গাণিতিক মডেলে ফ্রান্সের নাম বিজয়ী হিসেবে উঠে আসে এবং সর্বশেষ ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ট্রফি জয়ের সমীকরণও তিনি শতভাগ মেলাতে সক্ষম হয়েছিলেন। টানা তিনবার সফল হওয়ার পর এবার ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের জন্য তার তৈরি কম্পিউটার অ্যালগরিদম বিজয়ী হিসেবে নেদারল্যান্ডস দলকে বেছে নিয়েছে। তার মডেল অনুযায়ী, এবারের ফাইনালে নেদারল্যান্ডস মুখোমুখি হবে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পর্তুগালের এবং সেখানে পর্তুগালকে পরাজিত করে ডাচরা প্রথমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হবে।
অর্থনৈতিক মডেলের পাঁচটি প্রধান নিয়ামক
খেলার মাঠে বল গড়ানোর আগেই একজন অর্থনীতিবিদ কীভাবে চ্যাম্পিয়ন নির্ধারণ করেন, তা নিয়ে অনেকের মনেই কৌতুহল রয়েছে। ক্লেমেন্ট মূলত তার এই বিশেষ ইকোনোমেট্রিক বা অর্থনৈতিক মডেলে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক ব্যবহার করেন। এগুলো হলো:
মাথাপিছু জিডিপি: একটি দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা কেমন, যা ফুটবল অবকাঠামো ও উন্নত একাডেমি তৈরিতে বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করে।
জনসংখ্যা: ফুটবল সংস্কৃতি বিদ্যমান এমন দেশের জনসংখ্যা যত বেশি, সেখান থেকে উদীয়মান প্রতিভা খুঁজে বের করার সম্ভাবনা তত বৃদ্ধি পায়।
আবহাওয়া: কোনো দেশের গড় তাপমাত্রা অতিরিক্ত ঠান্ডা বা গরম কি না, যা ফুটবলারদের শারীরিক গঠন ও দীর্ঘমেয়াদী খেলা তৈরিতে প্রভাব ফেলে।
ফিফা র্যাংকিং: দলগুলোর বর্তমান ফর্ম, শক্তি এবং ধারাবাহিকতা পরিমাপের জন্য এটি ব্যবহার করা হয়।
স্বাগতিক দেশের সুবিধা: স্বাগতিক দেশ ঘরের মাঠে দর্শকদের কাছ থেকে যে বাড়তি মানসিক সমর্থন লাভ করে, তার একটি গাণিতিক হিসাব এই মডেলে যুক্ত করা হয়েছে।
নেদারল্যান্ডসের ফাইনালের পথ এবং ভাগ্যের ভূমিকা
ক্লেমেন্টের এই সিমুলেশন বা গাণিতিক অনুকরণ অনুযায়ী, নেদারল্যান্ডসের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পথটি মোটেও সহজ হবে না। ডাচদের ফাইনালে পৌঁছাতে হলে নকআউট পর্বে ক্রমান্বয়ে মরক্কো, কানাডা এবং কোয়ার্টার ফাইনালে শক্তিশালী ফ্রান্সকে পরাজিত করতে হবে। এরপর সেমিফাইনালে স্পেনের কঠিন বাধা অতিক্রম করতে পারলে তবেই তারা ফাইনালের টিকিট পাবে।
নিচে ক্লেমেন্টের গাণিতিক মডেলের প্রধান দিকসমূহ এবং নেদারল্যান্ডসের সম্ভাব্য যাত্রাপথের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা টেবিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| গাণিতিক মডেলের ভিত্তি (৫টি নিয়ামক) | নেদারল্যান্ডসের সম্ভাব্য নকআউট প্রতিপক্ষ | ক্লেমেন্টের বিগত সঠিক ভবিষ্যদ্বাণীসমূহ |
| ১. মাথাপিছু জিডিপি | ১. মরক্কো (রাউন্ড ৩২) | ১. ২০১৪ বিশ্বকাপ: জার্মানি |
| ২. মোট জনসংখ্যা | ২. কানাডা (রাউন্ড ১৬) | ২. ২০১৮ বিশ্বকাপ: ফ্রান্স |
| ৩. গড় আবহাওয়া ও তাপমাত্রা | ৩. ফ্রান্স (কোয়ার্টার ফাইনাল) | ৩. ২০২২ বিশ্বকাপ: আর্জেন্টিনা |
| ৪. বর্তমান ফিফা র্যাংকিং | ৪. স্পেন (সেমিফাইনাল) | ৪. ২০২৬ বিশ্বকাপ: নেদারল্যান্ডস (সম্ভাব্য) |
| ৫. স্বাগতিক দেশের বাড়তি সুবিধা | ৫. পর্তুগাল (ফাইনাল) |
তবে ব্রাজিল ভক্তদের এখনই সম্পূর্ণ হতাশ না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ক্লেমেন্ট। তিনি নিজেই উল্লেখ করেছেন যে, ফুটবলে মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি ভাগ্যের ছোঁয়াও একটি বিশাল বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। তার মতে, এই গাণিতিক মডেলে প্রায় ৪৫ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশ ফলাফল স্রেফ ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে। দুটি দলের শক্তি যখন কাছাকাছি থাকে, তখন নির্দিষ্ট দিনের ভাগ্যই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়। ফলে, পরপর তিনবার তার মডেল মিলে গেছে দেখে তার কাছে কোনো জাদুকরী ক্রিস্টাল বল বা অলৌকিক ক্ষমতা আছে, এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। এখন মাঠের লড়াইয়েই প্রমাণিত হবে যে ক্লেমেন্টের এই অ্যালগরিদম সফলতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারে নাকি মাঠের আসল লড়াইয়ে সব সমীকরণ ওলটপালট হয়ে যায়।
