২০২৬ বিশ্বকাপ খেলে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানাবেন নেইমার

অভিজ্ঞ ফরোয়ার্ড নেইমার জুনিয়র নানা ঘাত-প্রতিঘাত ও চোটের ধকল কাটিয়ে অবশেষে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ দলে নিজের জায়গা সুনিশ্চিত করতে সমর্থ হয়েছেন। ব্রাজিলের বর্তমান প্রধান কোচ কার্লো আনচেলত্তি সেলেসাওদের দায়িত্ব গ্রহণের পর বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক ম্যাচে ডাগআউটে দাঁড়ালেও এই অভিজ্ঞ ফরোয়ার্ড চোট ও অন্যান্য সমস্যার কারণে দলের বাইরে ছিলেন। তবে দীর্ঘ আড়াই বছরের দীর্ঘ বিরতি ও উপেক্ষা শেষে আবারও ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী হলুদ শিবিরে ডাক পেয়েছেন নেইমার জুনিয়র। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ২০২৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় যৌথভাবে অনুষ্ঠিতব্য ফিফা বিশ্বকাপ হবে নেইমারের ক্যারিয়ারের চতুর্থ বিশ্বকাপ আসর। তবে এই গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বমঞ্চে মাঠে নামার আগেই তিনি স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, এটিই হতে যাচ্ছে তার ফুটবল ক্যারিয়ারের শেষ আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট।

ফিফার পোস্টে নেইমারের ‘লাস্ট ড্যান্স’ বার্তা

ফিফার অফিসিয়াল ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডেলের একটি পোস্টে মন্তব্য করে নেইমার নিজেই নিশ্চিত করেছেন যে, ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ আসরটিই হবে তার আন্তর্জাতিক ফুটবল ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়। ফিফা বিশ্বকাপের অফিসিয়াল অ্যাকাউন্ট থেকে নেইমারের বিগত তিনটি বিশ্বকাপের কিছু স্মরণীয় ছবি প্রকাশ করা হলে, সেই পোস্টের নিচে মন্তব্য করতে গিয়ে ব্রাজিলের এই তারকা খেলোয়াড় সংক্ষিপ্তভাবে লেখেন, ‘দ্য লাস্ট ড্যান্স’। তার এই সংক্ষিপ্ত অথচ তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য ফুটবল বিশ্বে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, ২০২৬ বিশ্বকাপের পর তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায় নিতে যাচ্ছেন। তার এই ঘোষণা বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ফুটবল ভক্তের মাঝে সাড়া ফেলেছে এবং একটি যুগের অবসানের বার্তা দিচ্ছে।

নেইমারের বিগত বিশ্বকাপসমূহের খতিয়ান ও প্রাপ্তি

নেইমার জুনিয়র এর আগে ২০১৪ সালে নিজের দেশের মাটিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে প্রথমবার ব্রাজিল জাতীয় দলের হয়ে বিশ্বমঞ্চে অংশ নেন। সেই আসরে তার দল সেমিফাইনালে উঠেছিল, যদিও কোয়ার্টার ফাইনালে কলম্বিয়ার বিপক্ষে পিঠের কশেরুকার গুরুতর চোটের কারণে তিনি শেষ ম্যাচগুলোতে খেলতে পারেননি। এরপর তিনি যথাক্রমে ২০১৮ সালে রাশিয়া এবং ২০২২ সালে কাতারে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ আসরেও ব্রাজিলের আক্রমণভাগের মূল নেতৃত্ব দিয়েছেন। তবে বিগত সেই দুটি আসরেই ব্রাজিল দলকে কোয়ার্টার ফাইনাল পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয়েছিল। ২০২৬ সালের এই আসন্ন আসরে নেইমার ব্রাজিলের দীর্ঘদিনের ট্রফি খরা ঘোচাতে বিশেষভাবে মরিয়া, কারণ ২০০২ সালের পর গত ২৪ বছরে সেলেসাওরা আর কোনো বিশ্বকাপের শিরোপা নিজেদের ঘরে তুলতে পারেনি।

চোটের বর্তমান পরিস্থিতি ও সাম্প্রতিক ম্যাচসমূহ

বর্তমানে নেইমার গ্রেড-২ কাফ ইনজুরি বা পায়ের পেশির চোট থেকে সেরে ওঠার প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছেন এবং চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী শিগগিরই তিনি পুরোদমে অনুশীলনে ফিরবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এই চোটের কারণে সম্প্রতি পানামার বিপক্ষে অনুষ্ঠিত প্রীতি ম্যাচে তিনি মাঠে নামতে পারেননি, যে ম্যাচে ব্রাজিল ৬-২ গোলের বড় ব্যবধানে জয়লাভ করে। এর আগে মিশরের বিপক্ষে অনুষ্ঠিত ম্যাচেও চোটের কারণে মাঠের বাইরে থাকতে হয়েছিল নেইমারকে। চোটের বর্তমান পরিস্থিতির কারণে প্রত্যাশিতভাবেই পানামা ম্যাচের একাদশে এই তারকাকে রাখা সম্ভব হয়নি। ফুটবল বিশেষজ্ঞদের একাংশ ধারণা করছেন, বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে ব্রাজিলের হয়ে মাঠে নামার জন্য তিনি হয়তো শতভাগ ফিট হতে পারবেন না।

কোচ কার্লো আনচেলত্তির পরিকল্পনা ও প্রত্যাশা

তবে চোটের শঙ্কা থাকলেও ব্রাজিল জাতীয় দলের প্রধান কোচ কার্লো আনচেলত্তি আশাবাদী বার্তা দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন যে, দলের কোচিং স্টাফ ও চিকিৎসকেরা আশা করছেন বিশ্বকাপের শুরু থেকেই নেইমারকে পুরোপুরি ফিট অবস্থায় স্কোয়াডে পাওয়া যাবে। এমনকি মরক্কোর বিপক্ষে ব্রাজিলের উদ্বোধনী ম্যাচ অথবা তার ঠিক পরের ম্যাচেই তিনি চোট কাটিয়ে মাঠে ফিরতে পারেন। আনচেলত্তি আরও জোর দিয়ে উল্লেখ করেছেন যে, বিশ্বকাপের বর্তমান স্কোয়াডে তিনি আর কোনো ধরনের পরিবর্তন আনতে চান না। বিশ্বকাপের চূড়ান্ত দলে যাদের ডাকা হয়েছে, তারা সবাই মূল দলের সঙ্গেই অবস্থান করবেন এবং সেখান থেকেই দলের শক্তি বৃদ্ধি করবেন।

বিশ্বকাপে নেইমারের ব্যক্তিগত পরিসংখ্যান

ব্রাজিলের জার্সিতে বিশ্বমঞ্চে নেইমারের পরিসংখ্যান বেশ উজ্জ্বল ও নজরকাড়া। এ পর্যন্ত বিশ্বকাপে মোট ১৩টি ম্যাচ খেলেছেন তিনি, যেখানে দেশের হয়ে ৮টি গোল করেছেন এবং সতীর্থদের দিয়ে আরও ৩টি গোল করিয়েছেন (অ্যাসিস্ট)। বিশ্বকাপে তার সর্বশেষ গোলটি এসেছিল ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে, যা অতিরিক্ত সময়ের খেলা শেষে ১-১ গোলে ড্র হয়েছিল। পরবর্তীতে টাইব্রেকারে রদ্রিগো এবং মার্কিউনহোসের পেনাল্টি মিসের কারণে আসর থেকে বিদায় নিতে হয়েছিল ব্রাজিলকে। এবার সেই আক্ষেপ ঘুচিয়ে নিজের বিদায়ী বিশ্বকাপ স্মরণীয় রাখাই নেইমারের মূল লক্ষ্য।

আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সামগ্রিক অর্জন

ব্রাজিল জাতীয় দলের হয়ে নেইমার জুনিয়রের অবদান অনন্য। তিনি সেলেসাওদের ইতিহাসের অন্যতম শীর্ষ গোলদাতা হিসেবে নিজের নাম প্রতিষ্ঠা করেছেন। পেলে এবং রোনালদোর মতো কিংবদন্তিদের পাশে তার নাম উচ্চারিত হয়। ২০১৩ সালের ফিফা কনফেডারেশন্স কাপ জয় এবং ২০১৬ সালের রিও অলিম্পিকে ব্রাজিলকে ঐতিহাসিক স্বর্ণপদক এনে দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি প্রধান ভূমিকা পালন করেছিলেন। যদিও চোটের কারণে ২০১৯ সালের কোপা আমেরিকা জয়ী দলে তিনি থাকতে পারেননি, তবুও ব্রাজিলের আধুনিক ফুটবল ইতিহাসে তার প্রভাব অপরিসীম। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে এই ট্রফি খরা কাটিয়ে শিরোপা জয় করতে পারলে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে তার এই বিদায় হবে ইতিহাসের অন্যতম সেরা বিদায়।

Leave a Comment