ইউরোপ মহাদেশের অন্যতম শক্তিশালী ফুটবল দল পর্তুগাল তাদের বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রথম ম্যাচটিতে কাঙ্ক্ষিত জয় তুলে নিতে সমর্থ হয়নি। দলের অভিজ্ঞ অধিনায়ক ও তারকা ফুটবলার ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর আন্তর্জাতিক ফুটবল ক্যারিয়ারের এক অনন্য রেকর্ড গড়ার দিনে আফ্রিকার লড়াকু প্রতিনিধি ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর (ডিআর কঙ্গো) মুখোমুখি হয়েছিল তারা। দুই দলের খেলোয়াড়দের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও আকর্ষণীয় ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত ১-১ গোলের সমতায় শেষ হয়েছে। এর ফলে পূর্ণ ৩ পয়েন্টের পরিবর্তে ১ পয়েন্ট করে ভাগাভাগি করেই উভয় দলকে মাঠ ছাড়তে হয়েছে।
রোনালদোর ঐতিহাসিক মাইলফলক ও প্রথমার্ধের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই
পর্তুগিজ ফুটবল দলের অধিনায়ক এবং বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ তারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর জন্য এই আন্তর্জাতিক ম্যাচটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও স্মরণীয়। এই নির্দিষ্ট ম্যাচে মাঠে নামার মধ্য দিয়ে তিনি বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে সম্পূর্ণ নতুন এবং অনন্য একটি মাইলফলক স্পর্শ করেন। এই অর্জনের মাধ্যমে তিনি ফুটবলের রেকর্ড বইয়ে নিজের নাম আরও একবার বেশ উজ্জ্বলভাবে পুনর্লিখন করলেন। স্বাভাবিকভাবেই পর্তুগিজ ফুটবল ভক্তদের পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে থাকা ফুটবলপ্রেমীদের গভীর দৃষ্টি ছিল এই পর্তুগিজ ফরোয়ার্ডের রেকর্ড ও মাঠের পারফরম্যান্সের দিকে। তবে ম্যাচজুড়ে ডিআর কঙ্গোর রক্ষণভাগের খেলোয়াড়েরা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে অত্যন্ত কড়া পাহারায় বা নজরদারিতে রাখেন। কঙ্গোর ডিফেন্ডারদের এমন আঁটসাঁট কৌশলের কারণে এই ঐতিহাসিক ম্যাচে রোনালদো একক দক্ষতায় বড় কোনো ব্যবধান গড়ে দিতে পারেননি।
ম্যাচের প্রথমার্ধের শুরু থেকেই দুই দলের ফুটবলাররা আক্রমণ এবং পাল্টা আক্রমণের চেনা কৌশল অবলম্বন করে খেলতে থাকেন। পর্তুগাল দল তাদের চিরচেনা প্রথাগত আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলার সর্বাত্মক চেষ্টা চালালেও আফ্রিকার দলটির শারীরিক ফুটবল ও শক্তিশালী রক্ষণাত্মক কৌশলের সামনে তাদের আক্রমণগুলো বারবার বাধাগ্রস্ত হতে থাকে। ডিআর কঙ্গোর মধ্যমাঠের ফুটবলাররা মাঠের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের অনুকূলে নেওয়ার জন্য অত্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করেন। একই সাথে তাঁরা পর্তুগালের আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের কাছে বল সরবরাহের নিয়মিত পথগুলো সফলভাবে বন্ধ করে দেন। দুই দলের এমন হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ফলে ম্যাচের প্রথমার্ধের নির্ধারিত খেলায় কোনো দলই গোল করে অচলাবস্থা ভাঙতে সমর্থ হয়নি। ফলে গোলশূন্য সমতা নিয়েই প্রথমার্ধ শেষ হয়।
দ্বিতীয়ার্ধের আক্রমণাত্মক ফুটবল ও গোলকিপিংয়ের তুমুল পরীক্ষা
ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধের খেলা শুরু হওয়ার পর দুই দলের কোচের রণকৌশলে কিছুটা দৃশ্যমান পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। ইউরোপের পরাশক্তি পর্তুগাল কাঙ্ক্ষিত গোলের দেখা পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে নিজেদের আক্রমণের ধার ও গতি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। দলের ফুটবলারদের এই ক্রমাগত আক্রমণের সুফলও আসে দ্রুত। ম্যাচের সুসংগঠিত একটি আক্রমণ থেকে কঙ্গোর রক্ষণভাগকে পরাস্ত করে চমৎকার এক গোল করতে সক্ষম হয় ইউরোপের এই প্রতিনিধি দল। তবে ১-০ গোলে পিছিয়ে পড়ার পর দমে যায়নি আফ্রিকার প্রতিনিধি ডিআর কঙ্গো। তারা সমতায় ফেরার লক্ষ্য নিয়ে মাঠের চারদিকে আক্রমণের গতি তীব্র করে তোলে। ম্যাচের শেষ দিকে এসে পর্তুগালের রক্ষণভাগের ডিফেন্ডারদের অনমনীয়তার অভাব ও সামান্য অসতর্কতাকে কাজে লাগিয়ে কঙ্গোর আক্রমণভাগের খেলোয়াড়েরা একটি দৃষ্টিনন্দন গোল করেন এবং ম্যাচটিকে ১-১ সমতায় ফিরিয়ে আনেন।
পর্তুগিজ ডিফেন্ডাররা গোলটি হজম করার পর পুনরায় ম্যাচে লিড নেওয়ার জন্য আক্রমণ চালালেও কঙ্গোর সুসংগঠিত ডিফেন্স লাইন আর কোনো বড় সুযোগ তৈরি করতে দেয়নি। বিশেষ করে কঙ্গোর গোলরক্ষক এবং ডিফেন্ডাররা পর্তুগালের একাধিক জোরালো ও নিশ্চিত গোলমুখী আক্রমণ অত্যন্ত দক্ষতার সাথে প্রতিহত করেন। অন্যদিকে কাউন্টার অ্যাটাক বা পাল্টা আক্রমণ থেকে আফ্রিকার দলটি বেশ বিপজ্জনক রূপ ধারণ করায় পর্তুগালের গোলরক্ষককেও বেশ কয়েকটি কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়েছে। রেফারি কর্তৃক ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজা পর্যন্ত কোনো দলই আর নতুন কোনো গোল উদযাপনে মেতে উঠতে না পারায় ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত ১-১ গোলের ড্রয়ে মীমাংসা হয়।
গ্রুপ পর্বের পয়েন্ট ভাগাভাগি ও ভবিষ্যতের সমীকরণ
এই ড্রয়ের ফলে নিজেদের বিশ্বকাপ মিশন ও যাত্রা প্রত্যাশামতো জয় দিয়ে শুরু করার যে পরিকল্পনা পর্তুগাল ফুটবল দল সাজিয়েছিল, তাতে বড় ধরনের একটি ধাক্কা লাগল। গ্রুপ পর্বের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রথম ম্যাচেই নিশ্চিত ২ পয়েন্ট হারিয়ে পর্তুগাল এখন গ্রুপ টেবিলের সমীকরণে কিছুটা বাড়তি চাপের মুখে পড়েছে। তবে ডিআর কঙ্গোর মতো দলের জন্য ইউরোপের অন্যতম সেরা ও তারকাবহুল ফুটবল দলের বিরুদ্ধে লড়াই করে ১ পয়েন্ট অর্জন করা একটি বড় ও ইতিবাচক সাফল্য হিসেবেই ফুটবল মহলে বিবেচিত হচ্ছে। প্রথম ম্যাচ থেকে অর্জিত এই ১ পয়েন্ট গ্রুপ পর্বের সামনের ম্যাচগুলোর জন্য কঙ্গোর খেলোয়াড়দের মানসিকভাবে বেশ আত্মবিশ্বাসী ও উজ্জীবিত করে তুলবে।
বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের কঠিন লড়াইয়ে টিকে থাকতে এবং পরবর্তী রাউন্ডের টিকিট নিশ্চিত করতে হলে পর্তুগাল দলকে তাদের পরবর্তী ম্যাচগুলোতে অবশ্যই পূর্ণ পয়েন্ট বা জয়ের ধারায় ফিরতে হবে। বিশেষ করে দলের আক্রমণভাগের গোল করার কার্যকারিতা বৃদ্ধি করা এবং রক্ষণভাগের শেষ মুহূর্তের অসতর্কতা সম্পূর্ণ দূর করার দিকে এখন থেকেই কোচকে বাড়তি মনোযোগ দিতে হবে। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর রেকর্ড গড়ার এই ঐতিহাসিক ম্যাচটি পর্তুগিজ ফুটবল ইতিহাসের পাতায় চমৎকারভাবে যুক্ত হলেও, দলের কাঙ্ক্ষিত পূর্ণ জয় না পাওয়ার একটি বড় আক্ষেপ ভক্তদের মনে রয়েই গেল। অন্যদিকে, কঙ্গো এই ম্যাচের ড্র থেকে পাওয়া আত্মবিশ্বাসকে পুঁজি করে গ্রুপ পর্বের পরবর্তী প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে আরও ইতিবাচক ফলাফল অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামবে।
