ফুটবল মাঠে পরাশক্তি জার্মানিকে হারানোর আনন্দ কেমন হতে পারে, তা দেখিয়ে দিল লাতিন আমেরিকার দেশ ইকুয়েডর। চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের স্তব্ধ করে ঐতিহাসিক এক জয় তুলে নিয়েছে তারা। আর এই অবিশ্বাস্য সাফল্য উদযাপনে কোনো কমতি রাখছেন না ইকুয়েডরের প্রেসিডেন্ট দানিয়েল নোবোয়া। প্রিয় দলের এমন স্মরণীয় জয়ের পরদিনই, অর্থাৎ আজ শুক্রবার, পুরো দেশজুড়ে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে ইকুয়েডর সরকার। সরকারি ও বেসরকারি—সব খাতের প্রতিষ্ঠানই এই ছুটির আওতায় থাকবে, যাতে দেশের প্রতিটি মানুষ জাতীয় গর্বের এই মুহূর্তটি একসঙ্গে উপভোগ করতে পারে।
নিউজার্সির ঐতিহ্যবাহী মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ‘ই’ গ্রুপের শেষ ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল এই দুই দল। ম্যাচের শুরুটা অবশ্য ইকুয়েডরের জন্য মোটেও সুখকর ছিল না। খেলা শুরুর মাত্র দ্বিতীয় মিনিটে লেরয় সানের দুর্দান্ত এক গোলে এগিয়ে যায় জার্মানি। অভিজ্ঞ জার্মানদের এমন আগ্রাসী সূচনার পর অনেকেই হয়তো ইকুয়েডরের পরাজয় দেখছিলেন। তবে মাঠের লড়াকু ফুটবলাররা এত সহজে হাল ছাড়ার পাত্র ছিলেন না। গোল খাওয়ার ঠিক পাঁচ মিনিট পরেই, অর্থাৎ সপ্তম মিনিটে নিলসন আঙ্গুলোর চমৎকার এক গোলে সমতায় ফেরে ইকুয়েডর। প্রথমার্ধের বাকিটা সময় দুই দলই আক্রমণ-প্রতিআক্রমণে ম্যাচ জমিয়ে তোলে।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই চরম উত্তেজনায় রূপ নেয় ম্যাচটি। মাঠের রেফারি জার্মানির পক্ষে একটি পেনাল্টির বাঁশি বাজালে ইকুয়েডর শিবিরে বিষাদের ছায়া নেমে আসে। তবে ফুটবল বিধাতা হয়তো সেদিন লাতিন আমেরিকার দলটির পক্ষেই ছিলেন। ভিএআর (ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি) প্রযুক্তির সাহায্যে দেখা যায়, জার্মানির ওই আক্রমণের বিল্ডআপের সময় একটি ফাউল হয়েছিল। ফলে পেনাল্টির সিদ্ধান্তটি বাতিল হয়, যা ম্যাচে ইকুয়েডরকে নতুন করে উজ্জীবিত করে তোলে। এরপর খেলার ৭৭ মিনিটে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। গঞ্জালো প্লাতার চমৎকার এক গোল পুরো স্টেডিয়ামকে উল্লাসে ভাসিয়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত ২-১ গোলের ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে মাঠ ছাড়ে ইকুয়েডর।
এই জয়ের ফলে আটটি সেরা তৃতীয় দলের একটি হিসেবে টুর্নামেন্টের নকআউট পর্বে খেলা নিশ্চিত করেছে তারা। মাঠে বসে এই রোমাঞ্চকর জয় সরাসরি উপভোগ করেছেন খোদ ইকুয়েডরের প্রেসিডেন্ট দানিয়েল নোবোয়া। গ্যালারিতে ছেলের পাশে বসে দলের প্রতিটি মুহূর্তের সাক্ষী ছিলেন তিনি। জয় আসতেই স্টেডিয়াম বক্সে তাঁর বুনো উল্লাসের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করা হয়, যা মুহূর্তেই লুফে নেয় ফুটবলপ্রেমীরা। ইকুয়েডরিয়ান সরকারের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, এই জয় কেবল একটি খেলা নয়, বরং এটি দেশের ঐক্য ও সম্মানের প্রতীক।
ইকুয়েডরের প্রভাবশালী সংবাদপত্র ‘এল কোমারসিও’ প্রেসিডেন্টের একটি আবেগঘন বিবৃতি প্রকাশ করেছে। খেলোয়াড় ও কোচকে ধন্যবাদ জানিয়ে নোবোয়া বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে দলটিকে নানা সমালোচনা, অপমান এবং কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। তবে সব প্রতিকূলতা মাড়িয়ে ছেলেরা পুরো দেশের মানুষের মুখে যে অনাবিল হাসি ফুটিয়েছে, তা অতুলনীয়। মাঠের সেই লড়াই আর মাঠের বাইরের এই বাঁধভাঙা উল্লাস প্রমাণ করে, ফুটবল কীভাবে একটি জাতিকে এক সুতোয় গেঁথে ফেলতে পারে।
