ব্রাজিলের তারকা ফরোয়ার্ড ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের রহস্য কী? এই প্রশ্নের নির্দিষ্ট কোনো উত্তর হয়তো নেই। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন ফুটবলপ্রেমীদের মাঝে ঘুরে বেড়াচ্ছে বেশ মজার এক আলোচনা। ভাইরাল হওয়া কয়েকটি ছবি ও ভিডিও দেখে অনেকের মনেই কৌতুহল জেগেছে—ভিনিসিয়ুসের পায়ের জাদুর নেপথ্যে কি তবে লুকিয়ে আছে আনারস?
চলতি ২০২৬ বিশ্বকাপে হাইতির বিপক্ষে ম্যাচের আগে টানেল দিয়ে মাঠে যাওয়ার সময় ভিনির হাতে দেখা গেছে আনারসের টুকরো। আরেকটি ভিডিওতে আরও স্পষ্ট করে ধরা পড়েছে বিষয়টি। সেখানে দেখা যায়, ওয়ার্ম-আপের সময় এবং প্রথমার্ধের বিরতি শেষে দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হওয়ার ঠিক আগেও বেশ নিশ্চিন্ত মনে আনারস খাচ্ছেন ব্রাজিলিয়ান এই উইঙ্গার। মুহূর্তের মধ্যেই সেই দৃশ্য ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, যা নিয়ে শুরু হয় ব্যাপক চর্চা।
পুরনো অভ্যাস ও ‘লাকি চার্ম’
তবে ভিনির জন্য এটি মোটেও নতুন কোনো অভ্যাস নয়। ক্লাব ফুটবলে স্প্যানিশ জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে খেলার সময়ও ম্যাচের আগে ডাগআউট কিংবা টানেলে একাধিকবার তাকে ফল খেতে দেখা গেছে। তবে এই অভ্যাসটি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছিল ২০২৪ সালের স্প্যানিশ সুপার কাপের ফাইনালে। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনার বিপক্ষে সেই হাইভোল্টেজ ‘এল ক্লাসিকো’ ম্যাচের আগে আনারস খেয়ে মাঠে নেমেছিলেন তিনি। ফলস্বরূপ, বার্সার রক্ষণভাগ চূর্ণবিচূর্ণ করে দুর্দান্ত এক হ্যাটট্রিক করেছিলেন এই উইঙ্গার, আর রিয়াল মাদ্রিদ ঘরে তুলেছিল শিরোপা। এরপর থেকেই সমর্থকদের অনেকে মজা করে বলতে শুরু করেন, আনারসই বুঝি ভিনির ‘লাকি চার্ম’।
পুষ্টিবিদদের চোখে আনারসের গুণাগুণ
ফুটবলারদের জন্য আনারস কেন এত কার্যকরী, তা নিয়ে কথা বলেছেন ক্রীড়া পুষ্টিবিদরা। উচ্চগতির ফুটবলে একজন খেলোয়াড়কে টানা ৯০ মিনিট বা তার বেশি সময় ধরে মাঠে দৌড়ে বেড়াতে হয়। এর জন্য প্রয়োজন তাৎক্ষণিক শক্তি ও ক্লান্তিহীন শরীর। আনারসের পুষ্টিগুণ এই চাহিদাগুলো চমৎকারভাবে পূরণ করে।
দ্রুত শক্তির উৎস: আনারসে থাকা প্রাকৃতিক কার্বোহাইড্রেট শরীরে খুব দ্রুত শক্তি জোগায়। অথচ এটি খাওয়ার পর পেটে কোনো ধরনের ভারী অনুভূতি বা অস্বস্তি তৈরি হয় না, যা ফুটবলারদের হালকা ও সতেজ রাখতে সাহায্য করে।
হাইড্রেটেড থাকা: এই ফলের প্রায় ৮৫ শতাংশই পানি। ফলে তীব্র গরমে বা অতিরিক্ত পরিশ্রমে শরীর থেকে যে পানি ঝরে যায়, তা দ্রুত পূরণ করে শরীরকে হাইড্রেটেড রাখতে আনারস দারুণ ভূমিকা রাখে।
ক্লান্তি দূর করা: আনারসে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি থাকে। তীব্র শারীরিক পরিশ্রমের ফলে খেলোয়াড়দের শরীরে যে ক্লান্তি ও অক্সিডেটিভ স্ট্রেস তৈরি হয়, তা কমাতে এই ভিটামিন অত্যন্ত কার্যকর।
পেশির পুনরুদ্ধার ও ব্রোমেলিন: আনারসে রয়েছে ‘ব্রোমেলিন’ নামের একটি বিশেষ ও শক্তিশালী প্রাকৃতিক এনজাইম। এটি প্রোটিন হজম করতে সাহায্য করার পাশাপাশি ম্যাচের ধকল শেষে খেলোয়াড়দের পেশির ক্লান্তি ও ক্ষয় দূর করে দ্রুত শরীর পুনর্গঠনে (পেশির পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া) সাহায্য করে।
ব্রাজিল দলের বিশেষ পুষ্টি পরিকল্পনা
ভিনিসিয়ুসের এই ফল খাওয়ার পেছনে শুধু ব্যক্তিগত পছন্দ নয়, বরং ব্রাজিল জাতীয় দলের সুনির্দিষ্ট পুষ্টি পরিকল্পনাও জড়িয়ে আছে। সেলেসাওদের মেডিকেল ও পুষ্টি বিভাগ ম্যাচের আগে খেলোয়াড়দের ডায়েটে কলা এবং আনারসের মতো ফল নিয়মিত রাখে। এগুলো দীর্ঘ সময় ধরে মাঠে উচ্চগতির ফুটবল খেলার জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টির জোগান দেয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এটিকে ‘লাকি চার্ম’ বা ভাগ্য বলে যতই মজা করা হোক না কেন, এর পেছনে যে পুরোপুরি আধুনিক ক্রীড়া বিজ্ঞান ও সঠিক পুষ্টি পরিকল্পনা কাজ করছে, তা বলাই বাহুল্য। আর সেই বিজ্ঞানের হাত ধরেই মাঠের পর মাঠ মাতিয়ে যাচ্ছেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র।
