ফুটবল বিশ্বের অন্যতম চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দুই পরাশক্তি আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড দীর্ঘ ২৪ বছর পর আবারও বিশ্বকাপের মঞ্চে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। আগামী ১৬ জুলাই আটলান্টায় টুর্নামেন্টের সেমিফাইনালে লড়বে এই দুই দল। ২০০২ সালের পর বৈশ্বিক মঞ্চে তাদের আর দেখা হয়নি। তবে এবারের লড়াইটি কেবলই গ্রুপ পর্বের কোনো ম্যাচ নয়, এটি সরাসরি ফাইনালের টিকিট কাটার নকআউট যুদ্ধ। নকআউট পর্বে এই দুই দলের লড়াই মানেই ফুটবল ইতিহাসের পাতায় নতুন কোনো মহাকাব্যের জন্ম হওয়া। আর এই হাইভোল্টেজ ম্যাচের আগেই ফুটবলপ্রেমীদের মনে দোলা দিচ্ছে প্রায় চার দশক আগের এক ঐতিহাসিক ও বিতর্কিত ম্যাচের স্মৃতি।
বিশ্বকাপের নকআউটে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড শেষবার মুখোমুখি হয়েছিল ১৯৯৮ সালে। তবে ইতিহাসের পাতায় সবচেয়ে বেশি আলোড়ন তৈরি করেছিল ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো সিটির কোয়ার্টার ফাইনাল। সেই ম্যাচের আবহ শুধু মাঠের ফুটবলেই সীমাবদ্ধ ছিল না, এর পেছনে কাজ করেছিল এক বড় রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ। ১৯৮২ সালে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়, যাতে আর্জেন্টিনা পরাজিত হয়েছিল। এই যুদ্ধের মাত্র চার বছর পর ফুটবল মাঠে দুই দলের মুখোমুখি হওয়াটা দুই দেশের মানুষের কাছেই এক ভিন্ন মাত্রার মর্যাদার লড়াইয়ে রূপ নিয়েছিল।
১৯৮৬ সালের ২২ জুনের সেই ম্যাচে প্রথমার্ধ গোলশূন্য থাকার পর দ্বিতীয় ভিন্টেজ অর্ধে ডিয়েগো ম্যারাডোনা মাত্র চার মিনিটের ব্যবধানে এমন দুটি গোল করেন, যা ফুটবল ইতিহাসকে আজীবনের জন্য বদলে দেয়। ম্যাচের ৫১তম মিনিটে ইংল্যান্ডের পেনাল্টি বক্সের ভেতর বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে নিজেদের বক্সের দিকে বল ভাসিয়ে দেন ইংলিশ ডিফেন্ডার স্টিভ হজ। বলের দিকে একই সাথে ছুটে যান ইংল্যান্ডের দীর্ঘদেহী গোলরক্ষক পিটার শিলটন এবং আর্জেন্টিনার অধিনায়ক ডিয়েগো ম্যারাডোনা। শিলটন উচ্চতায় অনেক এগিয়ে থাকলেও ম্যারাডোনা চাতুর্যের আশ্রয় নেন। তিনি লাফিয়ে উঠে নিজের বাঁ হাত দিয়ে বলটি শিলটনের মাথার ওপর দিয়ে জালে ঠেলে দেন। তিউনিসিয়ান রেফারি আলি বিন নাসের বিষয়টি খেয়াল করতে না পারায় একে বৈধ গোল বলে ঘোষণা করেন।
ম্যাচ শেষে এই গোলটি নিয়ে বিশ্বজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। ম্যারাডোনা সংবাদ সম্মেলনে রসিকতা করে বলেছিলেন, গোলটি কিছুটা ম্যারাডোনার মাথা আর কিছুটা ঈশ্বরের হাত দিয়ে হয়েছিল। সেই থেকেই এটি ফুটবল ইতিহাসে ‘হ্যান্ড অব গড’ বা ‘ঈশ্বরের হাত’ নামে পরিচিতি পায়। এই গোলের রেশ কাটতে না কাটতেই ম্যারাডোনা মাঝমাঠ থেকে একাই ইংল্যান্ডের পাঁচ-ছয়জন ডিফেন্ডার ও গোলরক্ষককে কাটিয়ে ফুটবল ইতিহাসের সেরা গোলটি করেন, যা পরবর্তীতে ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ স্বীকৃতি পায়। ম্যাচটি আর্জেন্টিনা ২-১ ব্যবধানে জেতে এবং পরে সেই বিশ্বকাপের শিরোপাও নিজেদের ঘরে তোলে।
বিশ্বকাপের সামগ্রিক পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, মুখোমুখি লড়াইয়ে জয়ের দিক থেকে কিছুটা এগিয়ে রয়েছে ইংল্যান্ড। দুই দল এ পর্যন্ত বিশ্বকাপে মোট পাঁচবার মুখোমুখি হয়েছে, যার মধ্যে ইংল্যান্ড জিতেছে তিনটিতে আর আর্জেন্টিনা দুটিতে। তবে নকআউট পর্বের হিসাব পুরোপুরি আর্জেন্টিনার পক্ষে। ১৯৮৬ সালের কোয়ার্টার ফাইনালের পর ১৯৯৮ সালের শেষ ষোলোর বিখ্যাত ম্যাচেও শেষ হাসি হেসেছিল আলবিসেলেস্তারা। ১৯৯৮ সালের সেই ম্যাচটি মাইকেল ওয়েনের দর্শনীয় গোল, ডেভিড বেকহ্যামের লাল কার্ড এবং টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনার ৪-৩ ব্যবধানের জয়ের কারণে স্মরণীয় হয়ে আছে। অন্যদিকে, ইংল্যান্ড তাদের সবশেষ জয়টি পেয়েছিল ২০০২ সালের গ্রুপ পর্বে, যেখানে ডেভিড বেকহ্যামের পেনাল্টি গোলে ১-০ ব্যবধানে জিতেছিল থ্রি লায়ন্সরা।
দীর্ঘ ২৪ বছর পর বিশ্বকাপের মঞ্চে এবং প্রায় চার দশক পর নকআউটের সেমিফাইনালে এসে এই দুই পরাশক্তির লড়াই ফুটবল দুনিয়ায় এক চরম উত্তেজনার পারদ তৈরি করেছে। মাঠের লড়াইয়ে এবার লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা নাকি হ্যারি কেইনের ইংল্যান্ড শেষ হাসি হাসবে, তা দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে গোটা বিশ্ব।
