
বিতর্কিত রেফারি ইসমাইল এলফাথ সামলাবেন আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড সেমিফাইনাল মহারণ
ফিফা বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনালের রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে মাঠে নামছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এবং ইউরোপের পরাশক্তি ইংল্যান্ড। আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে এই হাইভোল্টেজ ম্যাচটি পরিচালনার গুরুদায়িত্ব পেয়েছেন মরক্কো বংশোদ্ভূত মার্কিন রেফারি ইসমাইল এলফাথ। ৪৪ বছর বয়সি অভিজ্ঞ এই রেফারি চলতি বিশ্বকাপে ইতোমধ্যে তিনটি ম্যাচ সফলভাবে পরিচালনা করলেও তার মাঠের কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে ফুটবল অঙ্গনে বেশ আলোচনা-সমালোচনা চলছে। আর্জেন্টিনার ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন ও সমর্থকদের কাছেও এলফাথ বেশ চেনা মুখ। কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ঐতিহাসিক জয়ের ম্যাচে তিনি চতুর্থ রেফারি হিসেবে মাঠের সাইডলাইনে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
এবারের আসরে এখন পর্যন্ত তিনটি ম্যাচ পরিচালনা করেছেন এলফাথ। ম্যাচগুলো হলো নেদারল্যান্ডস বনাম জাপান, স্পেন বনাম উরুগুয়ে এবং ব্রাজিল বনাম নরওয়ে। এই তিন ম্যাচে তিনি মোট আটটি হলুদ কার্ড এবং একটি সরাসরি লাল কার্ড দেখিয়েছেন। স্পেনের তরুণ ডিফেন্ডার পাও কুবার্সির ওপর বিপজ্জনক ট্যাকল করায় উরুগুয়ের ফুটবলার আগুস্তিন কানোব্বিওকে লাল কার্ড দেখান এলফাথ। এই লাল কার্ডের ধাক্কা সামলাতে না পেরে উরুগুয়েকে ম্যাচ থেকে ছিটকে যেতে হয়।
স্পেন-উরুগুয়ে ম্যাচে তার রেফারিং নিয়ে সবচেয়ে বেশি জলঘোলা হয়েছে। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি ছিল, শুরু থেকেই ম্যাচটির নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেননি এলফাথ। অতিরিক্ত শারীরিক সংঘর্ষে খেলোয়াড়রা জড়ালেও তিনি ছিলেন বেশ উদাসীন। বিশেষ করে নরউইচ সিটির উইঙ্গার ইনাকি উইলিয়ামস যখন উরুগুয়ের মিডফিল্ডার রদ্রিগো বেনতানকুরের ভয়াবহ ট্যাকলের শিকার হয়ে মাঠ ছাড়েন, তখন বেনতানকুরকে লাল কার্ড না দেখিয়ে কেবল হলুদ কার্ডে পার করে দেন এলফাথ। পরবর্তীতে ইনাকি উইলিয়ামসকে চোটের কারণে কয়েক ম্যাচের জন্য ছিটকে যেতে হয়, যা নিয়ে ফুটবল মহলে তুমুল সমালোচনা হয়।
একইভাবে ব্রাজিল-নরওয়ে ম্যাচেও তার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। নরওয়ের ক্রিস্টোফার আজারের চ্যালেঞ্জে ম্যাথেউস কুনহা বক্সের ভেতর পড়ে গেলেও প্রথমে পেনাল্টির বাঁশি বাজাননি এলফাথ। পরবর্তীতে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা ভিএআর (VAR)-এর হস্তক্ষেপে তিনি পেনাল্টির সিদ্ধান্ত দেন। যদিও সেই পেনাল্টি থেকে ব্রুনো গিমারায়েস গোল করতে ব্যর্থ হন। পরবর্তীতে ব্রাজিলের পক্ষে আরও একটি পেনাল্টি দিলে তা থেকে গোল আদায় করেন নেইমার, তবে শেষ পর্যন্ত নরওয়ের বিপক্ষে হার এড়াতে পারেনি সেলেসাওরা। ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজার পর মাঠের ভেতর খেলোয়াড়দের মধ্যে চরম উত্তেজনা ছড়ায়, যা নিয়ন্ত্রণে রেফারিকে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল।
ব্যক্তিগত জীবনে দারুণ এক কাহিনীর মধ্য দিয়ে রেফারিংয়ে এসেছেন এলফাথ। মরক্কোর কাসাব্লাঙ্কায় জন্ম নেওয়া এই রেফারি মাত্র ১৮ বছর বয়সে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে পাড়ি জমিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ে। ফুটবলার হিসেবে ক্যারিয়ার গড়ার ইচ্ছা থাকলেও জীবনের মোড় ঘুরে যায় ২০০১ সালে, যখন তিনি ডাইভারসিটি ভিসা (ডিভি) লটারির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী নাগরিকত্ব পান। এরপর তিনি পুরোদমে রেফারিংকে পেশা হিসেবে বেছে নেন।
২০১৬ সাল থেকে ফিফার আন্তর্জাতিক প্যানেলে থাকা এলফাথ যুক্তরাষ্ট্রের ঘরোয়া লিগ ‘মেজর লিগ সকার’ (MLS)-এ নিয়মিত ম্যাচ পরিচালনা করেন। এই সুবাদে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসির সাথে তার বহুবার মাঠে সাক্ষাৎ হয়েছে। ২০২৩ সালের লিগস কাপের ফাইনালে ইন্টার মিয়ামি ও ন্যাশভিলের মধ্যকার ম্যাচেও প্রধান রেফারি ছিলেন তিনি, যে ম্যাচে মেসির মিয়ামি টাইব্রেকারে জয়ী হয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল।
জাতীয় দল পর্যায়ে টোকিও অলিম্পিকেও আর্জেন্টিনার ম্যাচ পরিচালনার অভিজ্ঞতা রয়েছে এলফাথের। ২০২০ অলিম্পিকের গ্রুপ পর্বের সেই ম্যাচটি ১-১ গোলে ড্র হওয়ায় আসর থেকে ছিটকে গিয়েছিল আর্জেন্টিনা। বর্তমান আলবিসেলেস্তে স্কোয়াডের ফাকুন্দো মেদিনা ও অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার সেদিনের ম্যাচে আর্জেন্টিনার হয়ে মাঠে নেমেছিলেন।
কাতার বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে পর্তুগাল-ঘানা, ক্যামেরুন-ব্রাজিল এবং নকআউট পর্বে জাপান-ক্রোয়েশিয়ার মধ্যকার ম্যাচ পরিচালনার পর এটি এলফাথের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ। আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড সেমিফাইনালে তার প্রধান সহকারী হিসেবে কাজ করবেন যুক্তরাষ্ট্রের কোরি পার্কার ও কাইল অ্যাটকিনস। মাঠের বাইরে চতুর্থ রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন ইতালির মাউরিজিও মারিয়ানি। হাইভোল্টেজ এই সেমিফাইনালে রেফারিদের প্রতিটি সিদ্ধান্তই ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দিতে পারে, তাই কোটি ফুটবলপ্রেমীর নজর থাকবে রেফারি ইসমাইল এলফাথের দিকেও।