
রিয়াল মাদ্রিদের আয় ছুঁলো রেকর্ড উচ্চতা
ইউরোপীয় ফুটবলের অর্থনৈতিক শক্তির মানদণ্ডে আবারও শীর্ষে নিজের অবস্থান নিশ্চিত করেছে রিয়াল মাদ্রিদ। ২০২৫-২৬ মৌসুমে ক্লাবটির বার্ষিক পরিচালন আয় পৌঁছেছে ১.২২১ বিলিয়ন ইউরোতে, যা বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে একটি নতুন ইতিহাস। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো কোনো ক্রীড়া প্রতিষ্ঠান ১.২ বিলিয়ন ইউরোর বেশি আয় করার নজির গড়ল স্পেনের এই ক্লাব। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই আয়ের হিসাবে খেলোয়াড় বিক্রি থেকে প্রাপ্ত অর্থ ধরা হয়নি।
ফোর্বসের হিসাব বলছে, আগের মৌসুমের তুলনায় রিয়ালের আয় বেড়েছে ৩.১ শতাংশ। একই সময়ে ডেলয়েট ফুটবল মানি লিগেও তারা শীর্ষে রয়েছে। তালিকায় তাদের পরেই আছে বার্সেলোনা, বায়ার্ন মিউনিখ, পিএসজি এবং লিভারপুল—যা ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলে রিয়ালের ধারাবাহিক আর্থিক আধিপত্যেরই প্রতিফলন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি মাঠের পারফরম্যান্স নয়, বরং পরিকল্পিত বাণিজ্যিক কৌশল। স্টেডিয়ামের বহুমুখী ব্যবহার, শক্তিশালী বিপণন কাঠামো এবং বড় বড় স্পনসরশিপ চুক্তিই এখন আয়ের প্রধান উৎস। ফলে খেলার বাইরের খাতগুলোতেই ক্লাবটির আর্থিক ভিত্তি আরও মজবুত হয়েছে।
এই পরিবর্তনের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে সান্তিয়াগো বার্নাব্যু স্টেডিয়ামের আধুনিকায়ন। ২০১৮-১৯ মৌসুমে সংস্কার কাজ শুরুর আগে ক্লাবটির আয় ছিল ৭৫৭ মিলিয়ন ইউরো। কয়েক বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১.২২১ বিলিয়ন ইউরোতে, যা প্রায় ৬১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি। এই অতিরিক্ত আয়ের ৯৩ শতাংশই এসেছে ক্লাবের নিজস্ব বাণিজ্যিক উদ্যোগ থেকে।
স্টেডিয়াম সংস্কারের সুফল সরাসরি দেখা যাচ্ছে আয়ের খাতেও। বার্নাব্যু থেকে আয় ১০৭ শতাংশ বেড়ে ৩৬৩ মিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছেছে। বিপণন ও স্পনসরশিপ খাত থেকেও এসেছে ৫৩৯ মিলিয়ন ইউরো, যা আগের তুলনায় ৮২ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে, টেলিভিশন সম্প্রচারস্বত্ব ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা থেকে আয়ের প্রবৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে সীমিত, মাত্র ১১ শতাংশ।
চলতি মৌসুমেও এই প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রয়েছে। স্টেডিয়ামভিত্তিক আয় আরও ১১ শতাংশ বেড়েছে, আর বিপণন খাতের আয় বেড়েছে ৬ শতাংশ। ক্লাব কর্তৃপক্ষের মতে, আধুনিক বার্নাব্যু, নতুন বাণিজ্যিক অংশীদার এবং উন্নত স্পনসরশিপ চুক্তিই এই ধারাবাহিক উন্নতির মূল কারণ।
বার্নাব্যুর পুনর্নির্মাণে এখন পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ১.৪০৮ বিলিয়ন ইউরো এবং প্রকল্পটি প্রায় শেষ পর্যায়ে। সংস্কারের পর স্টেডিয়ামটি আগের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি আয় করছে বলে জানিয়েছে ক্লাব।
খরচ ব্যবস্থাপনাতেও শৃঙ্খলা বজায় রেখেছে রিয়াল মাদ্রিদ। খেলোয়াড়দের বেতন ও চুক্তি-সংক্রান্ত ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৬১৮ মিলিয়ন ইউরো, যা মোট আয়ের ৪৬ শতাংশ। ক্লাবের নির্ধারিত ৫০ শতাংশ সীমার মধ্যে থাকায় আর্থিক ভারসাম্যও অটুট রয়েছে।
গত মৌসুমে খেলোয়াড় কেনার পেছনে ব্যয় হয়েছে ১৬১ মিলিয়ন ইউরো। পাশাপাশি অবকাঠামো ও প্রযুক্তি খাতে আরও ১৯২ মিলিয়ন ইউরো বিনিয়োগ করা হয়েছে। বর্তমানে ক্লাবটির নিট সম্পদ ৬২৪ মিলিয়ন ইউরো এবং হাতে নগদ রয়েছে ৮৩ মিলিয়ন ইউরো। স্টেডিয়াম নির্মাণসংক্রান্ত ঋণ বাদ দিলে তাদের নিট ঋণ মাত্র ৯ মিলিয়ন ইউরো—যা একটি স্থিতিশীল আর্থিক অবস্থারই ইঙ্গিত দেয়।
সব মিলিয়ে, রিয়াল মাদ্রিদ শুধু মাঠে নয়, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাতেও এক নতুন মানদণ্ড তৈরি করেছে। ক্লাবটির এই ধারাবাহিক অগ্রগতি ইউরোপীয় ফুটবলের অর্থনৈতিক কাঠামোয় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে বলেই মনে করা হচ্ছে।