দীর্ঘদিনের জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ব্রাজিলিয়ান তারকা উইঙ্গার ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের সঙ্গে নতুন চুক্তি সম্পন্ন করেছে রিয়াল মাদ্রিদ। নতুন চুক্তি অনুযায়ী, ২৬ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড ২০৩২ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত স্প্যানিশ ক্লাবটির হয়েই খেলবেন। এর মাধ্যমে ইউরোপের বিভিন্ন শীর্ষ ক্লাবের আগ্রহের মধ্যেও নিজেদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়কে দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে রিয়াল।
ভিনিসিয়ুসের আগের চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে আর মাত্র এক বছর বাকি ছিল। ফলে গত কয়েক মাস ধরেই তার ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা গুঞ্জন চলছিল। বিশেষ করে ইংলিশ ক্লাব আর্সেনাল তাকে দলে নেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। তবে শেষ পর্যন্ত বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) রিয়াল মাদ্রিদ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেয় যে, দুই পক্ষ নতুন ছয় বছরের চুক্তিতে সম্মত হয়েছে।
চুক্তির ঘোষণার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেন ভিনিসিয়ুস। ইনস্টাগ্রামে দেওয়া এক আবেগঘন বার্তায় তিনি লেখেন, “বার্নাব্যুতে আট বছর খুবই কম… আরও ছয় বছর, এরপর চিরদিন।” তার এই মন্তব্যে রিয়াল সমর্থকদের প্রতি ভালোবাসা এবং ক্লাবের সঙ্গে দীর্ঘ পথচলার ইচ্ছাই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এক বিবৃতিতে রিয়াল মাদ্রিদ জানায়, ক্লাবের সাম্প্রতিক সবচেয়ে সফল সময়ের অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে উঠেছেন ভিনিসিয়ুস। বিবৃতিতে বলা হয়, তিনি শুধু দলের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ই নন, বরং বর্তমান প্রকল্পের অন্যতম ভিত্তিও।
চুক্তি নবায়নের বিষয়টি অবশ্য খুব সহজে সম্পন্ন হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা চললেও একপর্যায়ে তা অচলাবস্থায় পৌঁছেছিল। শেষ পর্যন্ত বুধবার রিয়াল নতুন একটি প্রস্তাব দেয় এবং সেটি ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেন ভিনিসিয়ুস। এরপর দ্রুতই সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়।
২০১৮ সালে ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব ফ্ল্যামেঙ্গো থেকে রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেন ভিনিসিয়ুস। শুরুতে মানিয়ে নিতে কিছুটা সময় লাগলেও ধীরে ধীরে তিনি ইউরোপের অন্যতম ভয়ংকর আক্রমণভাগের খেলোয়াড়ে পরিণত হন। তার গতি, ড্রিবলিং, একের বিপক্ষে এক পরিস্থিতিতে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করার দক্ষতা এবং বড় ম্যাচে কার্যকর পারফরম্যান্স তাকে রিয়ালের অপরিহার্য সদস্যে পরিণত করেছে।
২০২১ সালে প্রথমবার চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর পর গত প্রায় দেড় বছর ধরে আবার নতুন চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছিল। এই সময়ের মধ্যে ভিনিসিয়ুস একাধিকবার প্রকাশ্যে বলেছেন, রিয়াল মাদ্রিদই তার স্বপ্নের ক্লাব এবং দীর্ঘ সময় এখানেই থাকতে চান।
সম্প্রতি ব্রাজিল জাতীয় দলের হয়ে বিশ্বকাপের দায়িত্ব পালন শেষে সোমবার রিয়ালের প্রাক-মৌসুম প্রস্তুতি শিবিরে যোগ দেন তিনি। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্পন্ন করে ইতোমধ্যেই অনুশীলনও শুরু করেছেন। নতুন মৌসুমে তাকে ঘিরেই রিয়ালের আক্রমণভাগের পরিকল্পনা সাজানো হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পরিসংখ্যানও ভিনিসিয়ুসের গুরুত্ব স্পষ্ট করে। রিয়াল মাদ্রিদের জার্সিতে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে তিনি এখন পর্যন্ত ৩৭৫ ম্যাচে ১২৮টি গোল করেছেন। পাশাপাশি অসংখ্য গোলের সুযোগ তৈরি করে দলের সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। ব্রাজিল জাতীয় দলের হয়েও ৫৪ ম্যাচে তার গোলসংখ্যা ১৩।
ক্লাব পর্যায়ে ইতোমধ্যেই ভিনিসিয়ুস দুটি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, তিনটি লা লিগা এবং একটি কোপা দেল রে শিরোপা জিতেছেন। গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তার পারফরম্যান্স তাকে বিশ্বের সেরা উইঙ্গারদের একজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
সূত্রগুলোর দাবি, ভিনিসিয়ুস যদি নতুন চুক্তির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করতেন, তাহলে তাকে দলে ভেড়ানোর চেষ্টা আরও জোরালো করত আর্সেনাল। কিন্তু নতুন চুক্তির ফলে সেই সম্ভাবনা আপাতত পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে। ফলে ইংলিশ ক্লাবটিকে বাঁ প্রান্তের আক্রমণভাগ শক্তিশালী করতে অন্য বিকল্পের দিকে নজর দিতে হবে।
ভিনিসিয়ুসের চুক্তি নবায়নের দিনই রিয়াল মাদ্রিদ দলবদলের বাজারেও বড় ঘোষণা দেয়। জার্মান ক্লাব আরবি লাইপজিগ থেকে আইভোরি কোস্টের উইঙ্গার ইয়ান দিয়োমান্দেকে সর্বোচ্চ ১৪০ মিলিয়ন ইউরো ট্রান্সফার ফির বিনিময়ে দলে ভিড়িয়েছে স্প্যানিশ জায়ান্টরা। নতুন প্রধান কোচ জোসে মরিনিয়োর অধীনে এটি রিয়ালের গ্রীষ্মকালীন ষষ্ঠ সাইনিং। এর আগে বার্নার্দো সিলভা, ইব্রাহিমা কোনাতে, ডেনজেল ডামফ্রিস, মার্ক কুকুরেয়া এবং কার্লোস এসপিকেও দলে যুক্ত করেছে ক্লাবটি।
এদিকে দলবদলের বাজারে রিয়ালের তৎপরতা এখানেই শেষ হচ্ছে না। স্পেনের মিডফিল্ডার রদ্রিকে দলে ভেড়ানোর চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছে ক্লাবটি। যদিও এই লড়াইয়ে তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনা। ভিনিসিয়ুসের চুক্তি নবায়নের মাধ্যমে অবশ্য নতুন মৌসুমের আগে নিজেদের অন্যতম বড় লক্ষ্য পূরণ করেছে রিয়াল মাদ্রিদ, যা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার জন্যও বড় স্বস্তির খবর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
