
ব্যালন ডি’অরের দৌড়ে কেইন-ইয়ামাল, চমক দেখাবেন কে?
ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত পুরস্কার ব্যালন ডি’অর এবার কার হাতে উঠবে, তা নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে। ইংল্যান্ডের হ্যারি কেইন, স্পেনের লামিনে ইয়ামাল কিংবা ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে—সম্ভাব্য বিজয়ীদের আলোচনায় ঘুরেফিরে আসছে এই তিন তারকার নাম। তবে লিওনেল মেসির মতো অভিজ্ঞ তারকাকেও হিসাবের বাইরে রাখতে চাইছেন না অনেকে। সব জল্পনার অবসান ঘটিয়ে আজ সোমবার রাতে জানা যাবে, কে হচ্ছেন এবারের সেরা ফুটবলার।
ফ্রান্স ফুটবল সাময়িকীর আয়োজনে ব্যালন ডি’অর পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে লন্ডনের প্যালাডিয়াম থিয়েটারে। স্থানীয় সময় রাত ৮টায় শুরু হবে অনুষ্ঠান, যা বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার রাত ২টায়। ফুটবলের ব্যক্তিগত অর্জনের অন্যতম বড় স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত এই পুরস্কারের বিজয়ীর নাম ঘোষণার অপেক্ষায় রয়েছেন বিশ্বের কোটি কোটি সমর্থক।
ইএসপিএন সকারের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্ভাব্য বিজয়ীদের দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন ৩৩ বছর বয়সী ইংলিশ স্ট্রাইকার হ্যারি কেইন। তাদের পরিচালিত জরিপে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভোট পেয়েছেন বায়ার্ন মিউনিখের এই ফরোয়ার্ড। অন্যদিকে, ১৯ বছর বয়সী বার্সেলোনা তারকা লামিনে ইয়ামাল পেয়েছেন ২৮ শতাংশ ভোট। এই হিসাব অনুযায়ী কেইনের সঙ্গে ইয়ামালের ব্যবধান থাকলেও চূড়ান্ত ফলাফলের আগে নিশ্চিত করে কিছু বলার সুযোগ নেই।
আলোচনায় থাকা অন্য তারকাদের মধ্যে রয়েছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে ও লিওনেল মেসি। এ ছাড়া ৩০ জনের সংক্ষিপ্ত তালিকায় জায়গা পেয়েছেন আর্লিং হালান্ড, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রদ্রি, জুড বেলিংহাম, উসমান দেম্বেলে, মাইকেল ওলিসে, ভিতিনহা ও পাউ কুবার্সির মতো ফুটবলাররা। তবে শেষ মুহূর্তের আলোচনায় কেইন, ইয়ামাল ও এমবাপ্পেকে ঘিরেই বেশি আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
ইয়ামালের সামনে বড় সুযোগ
লামিনে ইয়ামালের পক্ষে রয়েছে বয়সের তুলনায় অসাধারণ পারফরম্যান্স, বার্সেলোনার হয়ে সাফল্য এবং স্পেনের হয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজের সামর্থ্য প্রমাণের অভিজ্ঞতা। গত মৌসুমে বার্সেলোনার হয়ে লা লিগা জয়ের পথে তিনি ১৬টি গোল করার পাশাপাশি ১১টি অ্যাসিস্ট করেন। দলের আক্রমণভাগে তাঁর গতি, ড্রিবলিং এবং সতীর্থদের গোলের সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার ক্ষমতা তাঁকে বিশেষভাবে আলোচনায় রেখেছে।
বিশ্বকাপের মঞ্চে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের কারণে ফাইনালের আগে লিওনেল মেসিকেও সম্ভাব্য বিজয়ী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল। ইয়ামাল ফাইনালে গোল করতে পারলে ব্যালন ডি’অরের দৌড়ে তাঁর অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারত বলে মনে করছেন অনেকে। তবে প্রতিপক্ষের পোস্ট লক্ষ্য করে চারটি শট নিয়েও গোল না পাওয়ায় তাঁর সম্ভাবনা কিছুটা কমেছে বলে বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছে। তা সত্ত্বেও স্পেনের বিশ্বকাপ জয় এবং বার্সেলোনার হয়ে তাঁর ধারাবাহিক নৈপুণ্য ইয়ামালকে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রেখেছে।
স্পেনের রেডিও স্টেশন কাদেনা কোপের তথ্য অনুযায়ী, ইয়ামাল ঘনিষ্ঠজনদের নিয়ে ব্যক্তিগত বিমানে লন্ডনে পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছেন। তবে অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার প্রস্তুতি বা আয়োজন থেকে তাঁর বিজয় নিশ্চিত বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
কেইনের পক্ষে গোলের হিসাব
হ্যারি কেইনের শক্তির জায়গা তাঁর অসাধারণ গোল করার সামর্থ্য। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত মৌসুমে বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে ৬৫ ম্যাচে ৭৩টি গোল করেছেন এই ইংলিশ স্ট্রাইকার। এমন গোলসংখ্যা তাঁকে ব্যালন ডি’অরের অন্যতম শক্তিশালী দাবিদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। গোল করার পাশাপাশি আক্রমণভাগে তাঁর অবস্থান নেওয়া, সুযোগ কাজে লাগানো এবং দলের ফলাফলে অবদান রাখার বিষয়গুলোও বিবেচনায় আসতে পারে।
তবে ব্যালন ডি’অর নির্ধারণে শুধু গোলসংখ্যাই চূড়ান্ত বিষয় নয়। ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের পাশাপাশি দলীয় সাফল্য, গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে অবদান এবং পুরো মৌসুমে ধারাবাহিকতাও আলোচনায় থাকে। এ কারণে কেইনের গোলের রেকর্ড যেমন তাঁকে এগিয়ে রাখছে, তেমনি ইয়ামালের দলীয় অর্জন ও ব্যক্তিগত নৈপুণ্যও তাঁকে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় টিকিয়ে রেখেছে। এমবাপ্পের ক্ষেত্রেও ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের গুরুত্ব কম নয়।
যেভাবে নির্ধারিত হয় বিজয়ী
ব্যালন ডি’অরের বিজয়ী নির্বাচন করেন ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ ১০০টি দেশের ১০০ জন অভিজ্ঞ সাংবাদিকের সমন্বয়ে গঠিত জুরি বোর্ড। প্রত্যেক বিচারক তাঁদের বিবেচনায় সেরা ১০ ফুটবলারকে ক্রমানুসারে নির্বাচন করেন। এরপর নির্ধারিত পদ্ধতিতে পয়েন্ট দেওয়া হয়।
প্রথম স্থানে থাকা ফুটবলার পান ১৫ পয়েন্ট। পরবর্তী অবস্থানগুলোর জন্য পয়েন্টের পরিমাণ যথাক্রমে ১২, ১০, ৮, ৭, ৫, ৪, ৩, ২ ও ১। সব বিচারকের দেওয়া পয়েন্ট যোগ করে সর্বোচ্চ পয়েন্ট পাওয়া ফুটবলারকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। ফলে বিভিন্ন জরিপে এগিয়ে থাকা কিংবা সমর্থকদের মধ্যে বেশি জনপ্রিয় হওয়া মানেই পুরস্কার নিশ্চিত হওয়া নয়। চূড়ান্ত ফল নির্ভর করে বিচারকদের ভোটের ওপর।
ঐতিহ্যগতভাবে প্যারিসে অনুষ্ঠিত হয়ে আসা ব্যালন ডি’অরের ৭০তম আয়োজন এবার লন্ডনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ১৯৫৬ সালে প্রথমবার এই পুরস্কার জিতেছিলেন ইংল্যান্ডের স্ট্যানলি ম্যাথুস। ব্ল্যাকপুল শহরে তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল সেই স্বীকৃতি। প্রথম বিজয়ীর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই এবারের অনুষ্ঠান লন্ডনে আয়োজন করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে এবারের ব্যালন ডি’অরের লড়াইয়ে কেইনের গোলের রেকর্ড, ইয়ামালের তারুণ্য ও দলীয় সাফল্য এবং এমবাপ্পের ব্যক্তিগত সামর্থ্য—সবকিছুই আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। জরিপে কেইন এগিয়ে থাকলেও শেষ পর্যন্ত সাংবাদিকদের ভোটে কে সেরা নির্বাচিত হন, তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণার জন্য।