
ব্যালন ডি’অর জয়ের পর এবার কেইনের নতুন লক্ষ্য কী?
ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় স্বপ্ন পূরণ করে ব্যালন ডি’অর জিতেছেন ইংল্যান্ডের তারকা স্ট্রাইকার হ্যারি কেইন। তবে ব্যক্তিগত এই অর্জনেই সন্তুষ্ট থাকতে চান না বায়ার্ন মিউনিখের এই ফরোয়ার্ড। এবার তাঁর লক্ষ্য ক্লাবের হয়ে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপা জয় এবং ইংল্যান্ড জাতীয় দলকে বড় কোনো আন্তর্জাতিক ট্রফি এনে দেওয়া।
সোমবার নিজের শহর লন্ডনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে ও স্পেনের লামিন ইয়ামালকে পেছনে ফেলে বিশ্বের সেরা ফুটবলারের স্বীকৃতি পান কেইন। ৩৩ বছর বয়সী এই ইংলিশ স্ট্রাইকারের হাত ধরে দীর্ঘ ২৫ বছর পর কোনো ইংল্যান্ডের ফুটবলার ব্যালন ডি’অর জিতলেন। ব্যক্তিগত এই সাফল্যের মধ্য দিয়ে নিজের ক্যারিয়ারে নতুন এক অধ্যায় যোগ করলেন তিনি।
গত মৌসুমে ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে ৬৫ ম্যাচে ৭৩টি গোল করেন কেইন। তাঁর ধারাবাহিক গোল করার দক্ষতা এবং আক্রমণভাগে কার্যকর ভূমিকা বায়ার্ন মিউনিখের সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। জার্মান ক্লাবটি ঘরোয়া লিগ ও কাপের শিরোপাও জেতে। ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের পাশাপাশি দলীয় সাফল্যে অবদান রাখার স্বীকৃতি হিসেবেই ব্যালন ডি’অর জয়কে দেখা হচ্ছে।
পুরস্কার হাতে পাওয়ার পর নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে কেইন বলেন, এই অর্জন শুধু তাঁর স্বপ্নপূরণ নয়, বরং কল্পনারও বাইরে ছিল। এমন স্বীকৃতিকে অবিশ্বাস্য বলে উল্লেখ করেন তিনি। লন্ডনের মঞ্চে দাঁড়িয়ে এই পুরস্কার গ্রহণ করাকে বিশেষ মুহূর্ত হিসেবে দেখছেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক। তাঁর মতে, এই অর্জন শুধু ব্যক্তিগত গর্বের বিষয় নয়; বরং পুরো ইংল্যান্ডের ফুটবলের জন্যও আনন্দের।
তবে ব্যক্তিগত স্বীকৃতি পাওয়ার পরও কেইনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। ইংল্যান্ড ও টটেনহ্যাম হটস্পারের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা হলেও ক্লাব ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ প্রতিযোগিতা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপা এখনো জিততে পারেননি তিনি। ২০২৩ সালে টটেনহ্যাম ছেড়ে বায়ার্ন মিউনিখে যোগ দেওয়ার পর তাঁর দলীয় সাফল্য মূলত জার্মানির ঘরোয়া প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে।
গত মৌসুমে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সেমিফাইনালে প্যারিস সাঁ জার্মেইয়ের (পিএসজি) কাছে হেরে বিদায় নেয় বায়ার্ন। ফলে ইউরোপসেরার মুকুট জয়ের অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হয় কেইনের। ব্যক্তিগতভাবে গোলের পর গোল করলেও মহাদেশীয় পর্যায়ে সর্বোচ্চ সাফল্য অর্জন করতে না পারার আক্ষেপ তাঁর ক্যারিয়ারে বড় একটি অপূর্ণতা হয়ে রয়েছে।
জাতীয় দলের হয়েও বড় শিরোপার অপেক্ষায় আছেন এই স্ট্রাইকার। ইংল্যান্ডের হয়ে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের ২০২১ ও ২০২৪ সালের ফাইনালে হারের অভিজ্ঞতা তাঁর জন্য হতাশার। বড় প্রতিযোগিতায় ভালো করার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও দলকে শিরোপা এনে দিতে না পারার বিষয়টি তাঁকে নতুন করে অনুপ্রাণিত করছে। এবার সেই অপেক্ষার অবসান ঘটানোই তাঁর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
কেইনের সামনে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছেন এমবাপ্পে ও ইয়ামালের মতো তারকারা। তাঁদের কেউ কেউ অল্প বয়সেই বিশ্বকাপ জয়ের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। অন্যদিকে, কেইনের ক্যারিয়ারের শুরুটা ছিল তুলনামূলক কঠিন। তরুণ বয়সে তাঁকে ভবিষ্যতের নিশ্চিত মহাতারকা হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি। বরং নিজের জায়গা প্রতিষ্ঠা করতে দীর্ঘ সময় ধরে লড়াই করতে হয়েছে তাঁকে।
টটেনহ্যামের মূল দলে নিয়মিত সুযোগ পাওয়ার আগে চারবার ধারে বিভিন্ন ক্লাবে খেলতে হয়েছিল কেইনকে। নিম্ন বিভাগের ক্লাবগুলোতে খেলার সেই অভিজ্ঞতা তাঁর পেশাদার জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। নিয়মিত খেলার সুযোগ পাওয়া, নিজের দক্ষতা প্রমাণ করা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার মধ্য দিয়েই ধীরে ধীরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন তিনি।
কেইনের ভাষ্য অনুযায়ী, ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় নিজেকে একজন পূর্ণাঙ্গ পেশাদার ফুটবলার হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। নিজের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা, খেলার মান উন্নত করা এবং আরও প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মানসিকতা তাঁকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।
শুরুর দিকের সংগ্রামকে নিজের সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে দেখেন কেইন। তাঁর মতে, ফুটবলে কোনো অর্জনই স্থায়ী নিশ্চয়তা দেয় না। জাতীয় দল কিংবা বায়ার্ন মিউনিখ—প্রতিটি জায়গাতেই দলে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে নিয়মিত ভালো খেলতে হয়। সতীর্থদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা এবং প্রতিপক্ষের চ্যালেঞ্জ তাঁকে আরও উন্নতি করতে উৎসাহিত করে।
ব্যালন ডি’অর জয় তাই কেইনের কাছে কোনো চূড়ান্ত গন্তব্য নয়; বরং সামনে এগিয়ে যাওয়ার নতুন প্রেরণা। ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বের সেরা ফুটবলারের স্বীকৃতি পাওয়ার পর এখন তিনি দলীয় সাফল্যের দিকে মনোযোগ দিতে চান। বায়ার্নের হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয় এবং ইংল্যান্ডের হয়ে বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা অর্জন করতে পারলে তাঁর ক্যারিয়ারের সাফল্যের খাতায় যুক্ত হবে আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।