
ভাঙা আঙুল নিয়ে বিশ্বযুদ্ধ, মার্তিনেজের হাতে স্থায়ী ক্ষতি
২০২৬ বিশ্বকাপের রোমাঞ্চকর ফাইনালে স্পেনের মুখোমুখি হয়ে আর্জেন্টিনার গোলপোস্টের নিচে একাই দেয়াল তুলে দাঁড়িয়েছিলেন এমিলিয়ানো মার্তিনেজ। লামিন ইয়ামাল, নিকো উইলিয়ামস কিংবা মিকেল মেরিনোদের নেওয়া একের পর এক বুলেট গতির শট ঠেকিয়ে ম্যাচজুড়ে একাই ১১টি দর্শনীয় সেভ করেছিলেন তিনি। কিন্তু সম্প্রতি সেই ঐতিহাসিক ম্যাচ ও পুরো টুর্নামেন্টকে ঘিরে এক চাঞ্চল্যকর ও অবিশ্বাস্য তথ্য প্রকাশ করেছেন আলবিসেলেস্তেদের এই তারকা গোলরক্ষক। তিনি জানিয়েছেন, ফাইনাল তো বটেই, পুরো বিশ্বকাপ টুর্নামেন্টজুড়েই তিনি খেলেছেন ডান হাতের আঙুল ভাঙা অবস্থায়। আর এই দুঃসাহসিক সিদ্ধান্তের চরম মূল্য হিসেবে তাঁর ডান হাতে তৈরি হয়েছে স্থায়ী শারীরিক ক্ষতি।
সম্প্রতি এক খোলামেলা সাক্ষাৎকারে নিজের হাতে তৈরি হওয়া এই চিরস্থায়ী ক্ষতির বিষয়টি প্রকাশ করেন ফুটবলের এই পোস্টার বয়। ভিডিও সাক্ষাৎকারে হাত দেখিয়ে তিনি জানান যে, দুর্ঘটনার পর থেকে তিনি ডান হাতের আঙুলগুলো আর পুরোপুরি মুষ্টিবদ্ধ বা বন্ধ করতে পারেন না। বিশেষ করে তাঁর অনামিকা আঙুলটি সবসময় আংশিক খোলা অবস্থায় থেকে যায়। মার্তিনেজ নিজেই নিশ্চিত করেছেন যে, এই শারীরিক ক্ষতিটি চিরস্থায়ী এবং বাকি জীবন তাঁকে এই অবস্থাতেই কাটাতে হবে। নিজের এই অনাকাঙ্ক্ষিত শারীরিক সীমাবদ্ধতা নিয়ে রসিকতা করে মার্তিনেজ বলেন, তিনি হয়তো আর জীবনে কাউকে শক্ত করে ঘুষি মারতে পারবেন না।
এই গুরুতর ইনজুরির সূত্রপাত হয়েছিল ২০২৬ সালের মে মাসে। অ্যাস্টন ভিলার হয়ে ফ্রাইবুর্গের বিরুদ্ধে ইউরোপা লিগের গুরুত্বপূর্ণ ফাইনাল ম্যাচের ঠিক পূর্বে ওয়ার্ম-আপ বা অনুশীলনের সময়ে মার্তিনেজের ডান হাতের অনামিকা ভেঙে যায় এবং স্থানচ্যুত হয়। তীব্র যন্ত্রণা থাকা সত্ত্বেও তিনি সেদিন পুরো ম্যাচ খেলেন এবং অ্যাস্টন ভিলাকে ৩-০ গোলের বড় জয় উপহার দেন। ম্যাচের পর অভিজ্ঞ অর্থোপেডিক চিকিৎসকেরা তাঁকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জরুরি অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দিয়েছিলেন। চিকিৎসকরা স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, দ্রুত সার্জারি না করালে হাড় স্বাভাবিকভাবে জোড়া লাগবে না এবং ভবিষ্যতে স্বাভাবিক ফুটবল ক্যারিয়ার বা শারীরিক সক্ষমতা দারুণভাবে বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
তবে চিকিৎসকদের সেই জরুরি পরামর্শ সত্ত্বেও মার্তিনেজ অস্ত্রোপচার না করার কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন। কারণ তাঁর সামনে তখন সবচেয়ে বড় স্বপ্ন—২০২৬ সালের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের জার্সি গায়ে গোলপোস্ট সামলানো। অস্ত্রোপচার করালে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল প্রবল। ফলে বিশ্বকাপের পুরো অভিযান জুড়ে তিনি ফিজিওর অধীনে বিশেষ পরিচর্যা, হাতের সুরক্ষামূলক স্প্লিন্ট ও বিশেষভাবে তৈরি গ্লাভস পরে মাঠে নামেন।
বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার প্রতিটি ম্যাচে পোস্টের নিচে বিশ্বস্ত পাহারাদার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ফাইনাল ম্যাচে স্পেনের বিপক্ষে ১-০ গোলে দল হেরে গেলেও ১১টি দুর্দান্ত সেভ দিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের মন জয় করে নেন এমি। গ্রুপ পর্বেও নিজের দুর্দান্ত ফর্ম বজায় রেখে ক্লিন শিট রেখেছিলেন তিনি। দেশের জন্য ট্রফি জয়ের লড়াইয়ে নিজের শরীরের স্থায়ী ক্ষতি বরণ করে নেওয়ার এই অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত বিশ্ব ফুটবলে মার্তিনেজের অদম্য মানসিকতা ও আত্মত্যাগের এক অনন্য প্রতীক হয়ে থাকবে।