আর্জেন্টিনার ১১ গোল খাওয়ার ইতিহাস
আর্জেন্টিনা ফুটবল দল—বিশ্ব ফুটবলের আকাশে এক চিরসবুজ ও রোমাঞ্চকর নাম। দিয়েগো ম্যারাডোনার ঈশ্বরপ্রদত্ত ড্রিবলিং, গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতার বুলেট শট, হুয়ান রোমান রিকেলমের জাদুকরী পাস থেকে শুরু করে আধুনিক ফুটবলের জাদুকর লিওনেল মেসি; প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই আকাশী-সাদা জার্সি বিশ্বকে দেখিয়েছে ফুটবলের নিখুঁত সৌন্দর্য। কিন্তু মুদ্রার যেমন এপিঠ-ওপিঠ থাকে, ফুটবলের ইতিহাসও তেমনি কেবল ট্রফি আর জয়ের গল্প দিয়ে লেখা হয় না। আর্জেন্টিনার এই আকাশছোঁয়া সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে কিছু চরম বিব্রতকর পরাজয়, কান্নার গল্প আর ফুটবল ইতিহাসের কিছু অন্ধকার অধ্যায়। ফুটবলপ্রেমীদের জন্য আজ থাকছে আর্জেন্টিনার সেই ভুলে যাওয়ার মতো অন্ধকার দিনগুলোর এক বাস্তবসম্মত খতিয়ান।
Table of Contents
১১ গোল খাওয়ার সেই দুঃসহ রাত: নারীদের বিশ্বকাপে জার্মানির তাণ্ডব
আর্জেন্টিনা ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং ফুটবলীয় পরিভাষায় ‘সবচেয়ে লজ্জাজনক’ বিপর্যয়টি ঘটেছিল ২০০৭ সালে। তবে সেটি পুরুষ দলের নয়, ঘটেছিল আর্জেন্টিনা নারী ফুটবল দলের সাথে। জার্মানিতে অনুষ্ঠিত সেবারের ফিফা নারী বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচেই ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন জার্মানির মুখোমুখি হয়েছিল আলবিসেলেস্তেরা। কে জানত, সেই ম্যাচটি আর্জেন্টিনার জন্য এক জীবন্ত দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠবে!
পুরো ম্যাচজুড়ে জার্মানি এমন এক ভয়ংকর তাণ্ডব চালিয়েছিল যে, ম্যাচ শেষে স্কোরবোর্ড দেখছিল—জার্মানি ১১, আর্জেন্টিনা ০। নারী বিশ্বকাপের ইতিহাসে এটি এখনো অন্যতম বৃহত্তম ব্যবধানের পরাজয়। ম্যাচের পর আর্জেন্টিনার তৎকালীন কোচ হোসে কার্লোস বোরেলো চরম হতাশ হয়ে একে আখ্যা দিয়েছিলেন ‘একটি দুঃস্বপ্নের সূচনা’ হিসেবে।
জার্মান ফরোয়ার্ড বির্গিট প্রিঞ্জ ও সান্দ্রা স্মিসেক সেদিন আর্জেন্টাইন ডিফেন্সকে ছেলেখেলা বানিয়ে প্রত্যেকে হ্যাটট্রিক করেছিলেন। এ ছাড়াও গোলবন্যার মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন ফরোয়ার্ড গ্যারেফ্রেক্স এবং মিডফিল্ডার বেহরিঙ্গার ও লিঙ্গররা। সেদিনের দুর্ভাগা আর্জেন্টাইন গোলরক্ষক ভানিনা কোরেয়ার জন্য দিনটি এতটাই অভিশপ্ত ছিল যে, কর্নার কিক থেকে আসা বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে দুই-দুবার তিনি নিজের জালেই বল জড়িয়ে বসেন। ম্যাচ শেষে জার্মান কোচ সিলভিয়া নিড গর্ব করে বলেছিলেন, “আমাদের আক্রমণ এক মুহূর্তের জন্যও থামেনি, আমরা উইংগুলোকে চমত্কারভাবে ব্যবহার করেছি।”
পুরুষ দলের ধসে পড়ার গল্প: যখন তাসের ঘরের মতো ভেঙেছিল ডিফেন্স
নারী দল তো মাত্র একবারই এমন বিপর্যয়ে পড়েছে, কিন্তু আর্জেন্টিনার পুরুষ দলও ইতিহাসের বিভিন্ন বাঁকে বড় বড় ঝড়ের মুখোমুখি হয়েছে। ফুটবল বিশ্বকে শাসন করা এই পরাশক্তিও বেশ কয়েকবার গোলবন্যায় ভেসে গেছে।
ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, ১৯৫৮ সালের সুইডেন বিশ্বকাপে চেকোস্লোভাকিয়ার কাছে ১-৬ গোলের বিশাল ব্যবধানে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিয়েছিল আর্জেন্টিনা। এর ঠিক পরের বছর, ১৯৫৯ সালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী উরুগুয়ের কাছে ০-৫ গোলে বিধ্বস্ত হতে হয়েছিল তাদের। এমনকি নিজেদের ঘরের মাঠ বুয়েনস আইরেসেও তারা নিরাপদ ছিল না; ১৯৯৩ সালে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে কলম্বিয়ার মার্সেলো আস্প্রিয়ো ও ফ্রেডি রিনকনরা বুয়েনস আইরেসকে স্তব্ধ করে দিয়ে আর্জেন্টিনাকে ০-৫ গোলে হারিয়ে ইতিহাস গড়েছিল।
তবে আধুনিক ফুটবলারদের প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছিল ২০০৯ সালে। কিংবদন্তি দিয়েগো ম্যারাডোনা তখন দলের প্রধান কোচ। বিশ্বকাপ বাছাই পর্বের ম্যাচে বলিভিয়ার লা পাজের চরম পাহাড়ি উচ্চতায় খেলতে নেমে অক্সিজেনের অভাবে ধুঁকতে ধুঁকতে আর্জেন্টিনা ম্যাচটি হেরে বসে ১-৬ গোলে। লিওনেল মেসি মাঠে থাকা সত্ত্বেও বলিভিয়ার চাতুর্য আর উচ্চতার চাপের কাছে দল তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছিল। এর বছরকয়েক পর, ২০১৮ সালে বিশ্বকাপের ঠিক আগে এক প্রীতি ম্যাচে স্পেনের মুখোমুখি হয় আর্জেন্টিনা। ইনজুরির কারণে মেসি সেদিন গ্যালারিতে বসা ছিলেন, আর মাঠের ভেতরে থাকা স্প্যানিশ আর্মাডারা মেসিবিহীন আর্জেন্টাইন ডিফেন্সকে কার্যত ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে ম্যাচটি জিতে নেয় ১-৬ ব্যবধানে।
লজ্জার ছাই ভস্ম থেকে ফিনিক্স পাখির মতো ঘুরে দাঁড়ানো
ফুটবলের সৌন্দর্য এটাই যে, এটি কাউকে চিরকাল মাটিতে ফেলে রাখে না। আর্জেন্টিনা আমাদের বারবার দেখিয়েছে কীভাবে ছাই থেকে ফিনিক্স পাখির মতো নতুন করে ডানা মেলতে হয়। অতীতের সেই দুঃসহ স্মৃতিগুলোকে পেছনে ফেলে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (AFA) তাদের পুরো কাঠামো বদলে ফেলে। বিশেষ করে লিওনেল স্কালোনির কাঁধে যখন দলের দায়িত্ব আসে, আলবিসেলেস্তেরা এক নতুন রূপ ধারণ করে।
স্কালোনির অধীনে তরুণ ও অভিজ্ঞদের মিশেলে গড়া দলটি টানা ২৯টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে অপরাজিত থাকার এক অবিশ্বাস্য রেকর্ড গড়ে। আর এর চূড়ান্ত ফল আসে ২০২১ সালের কোপা আমেরিকায়। মারাকানা স্টেডিয়ামে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলের বিপক্ষে ফাইনালের সেই মহানাটকীয় রাতে আনহেল দি মারিয়ার জাদুকরী চিপ শটে ১-০ গোলের জয় পায় আর্জেন্টিনা। এই এক জয়ে ঘুচে যায় দীর্ঘ ২৮ বছরের ট্রফির খরা, আর লিওনেল মেসির হাতে ওঠে আন্তর্জাতিক ফুটবলের প্রথম বড় কোনো মুকুট।
অতীতের শিক্ষা আর রাজকীয় শ্রেষ্ঠত্ব
২০২১ সালের কোপা আমেরিকা জয়ের সেই আত্মবিশ্বাস আর প্রত্যয়ই আর্জেন্টিনাকে নিয়ে যায় সাফল্যের সর্বোচ্চ শিখরে। যার চূড়ান্ত রূপ আমরা দেখেছি ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে। লুসাইল স্টেডিয়ামে ফ্রান্সের বিপক্ষে ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ফাইনাল ম্যাচ খেলে লিওনেল মেসি, আনহেল দি মারিয়া, এমিলিয়ানো মার্টিনেজ আর রদ্রিগো ডি পলরা আর্জেন্টিনাকে এনে দেন তাদের ইতিহাসের তৃতীয় বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের মুকুট।
আর্জেন্টিনার ইতিহাসের সেই ১১ গোল খাওয়ার দুঃস্মৃতি কিংবা ৫-৬ গোলের লজ্জাজনক পরাজয়গুলো আসলে আমাদের জীবনের এক পরম সত্যকে মনে করিয়ে দেয়—ফুটবল কিংবা বাস্তব জীবন, কোনোখানেই জয় আর গৌরব চিরস্থায়ী নয়। কখনো চরম অপমান আসবে, কখনো আসবে রাজকীয় গৌরব; এই সবকিছুর মিশ্রণেই তৈরি হয় একটি দলের আসল চরিত্র ও ইতিহাস।
আজকের আর্জেন্টিনা অতীতের সেই অন্ধকার দিনগুলোর শিক্ষা পকেটে নিয়ে বুক চিতিয়ে লড়াই করতে জানে। তারা বিশ্বকে দেখিয়েছে কীভাবে অপমানের স্তূপ থেকে উঠে এসে আবারও ফুটবলের রাজপথে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট ছিনিয়ে আনতে হয়। আর এই ঘুরে দাঁড়ানোর অদম্য জেদই আর্জেন্টিনাকে কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে অমর করে রেখেছে।
মন্তব্য দেখান