আটলান্টা স্টেডিয়ামের গ্যালারি তখন থ্রি লায়ন্স সমর্থকদের ‘ফুটবল ইজ কামিং হোম’ স্লোগানে প্রকম্পিত। ম্যাচের বয়স ৮৪ মিনিট, স্কোরবোর্ডে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে ইংল্যান্ড। ১৯৬৬ সালের পর দীর্ঘ ৬০ বছরেরও বেশি সময় পর আরও একটি বিশ্বকাপের ফাইনালে পা রাখার রঙিন স্বপ্নে বিভোর ইংলিশরা। কিন্তু ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় সাতটি মিনিট যে তখনও বাকি ছিল, তা কে জানত! মাত্র কয়েক মিনিটের এক অতিমানবীয় আর্জেন্টাইন ঝড়ে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল ইংল্যান্ডের সব প্রতিরোধ।
৫৫ মিনিটে আর্জেন্টিনার ডিফেন্সের ভুলে প্রথম গোলটি পেয়েছিল ইংল্যান্ড। চলতি বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের শুরু থেকেই আলবিসেলেস্তেদের রক্ষণের দুর্বলতা কিছুটা প্রকাশ পাচ্ছিল, আর সেই সুযোগটাই লুফে নেয় ইংলিশরা। তবে গোল পাওয়ার পর ইংল্যান্ডের জার্মান কোচ টমাস টুখেল যে রণকৌশল বেছে নেন, তা শেষ পর্যন্ত দলটির জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। ইউরোপের অন্যতম সেরা এই মাস্টারমাইন্ড আক্রমণাত্মক ধারা বজায় রাখার পরিবর্তে দলকে পুরোপুরি রক্ষণাত্মক খোলসে বন্দি করে ফেলেন। আর্জেন্টিনা যে চলতি আসরেই এর আগে দু-দুটি নকআউট ম্যাচে প্রথমে পিছিয়ে পড়েও অবিশ্বাস্যভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে ম্যাচ জিতেছিল—সেই পরিসংখ্যান জানার পরেও টুখেলের এই অতি-রক্ষণাত্মক ‘পার্ক দ্য বাস’ নীতি বড় ভুল প্রমাণিত হয়।
টুখেলের এই কৌশল মিনিট দশেকের মধ্যেই মুখ থুবড়ে পড়ে। রক্ষণ সামলাতে গিয়ে ইংল্যান্ড উল্টো মেসি-লাউতারোদের নিজেদের বক্সে আক্রমণ করার আমন্ত্রণ জানায়। আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ডদের একের পর এক ক্ষুরধার আক্রমণে দিশেহারা হয়ে পড়ে ইংলিশ ডিফেন্স। জর্ডান পিকফোর্ড একবার গোললাইন থেকে অবিশ্বাস্য দক্ষতায় বল ফিরিয়ে না দিলে এবং আর্জেন্টিনার আরেকটি শট পোস্টে লেগে প্রতিহত না হলে সমতা আরও আগেই আসত।
৮৪ মিনিট পার হওয়ার পর যখন ইংলিশরা একটু হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছিল, ঠিক তখনই শুরু হয় লিওনেল স্কালোনির শিষ্যদের সেই চিরচেনা রুদ্রমূর্তি। এই বিশ্বকাপে মিশর ও সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে একদম শেষ মুহূর্তে ম্যাচ ছিনিয়ে নেওয়ার যে মানসিকতা আর্জেন্টিনা দেখিয়েছিল, ঐতিহাসিকভাবে পরম শত্রু ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তা যেন আরও দ্বিগুণ শক্তিতে জ্বলে ওঠে।
ম্যাচের ৮৫ মিনিটে প্রথম আঘাতটি হানেন এনজো ফার্নান্দেজ। ডি-বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া তাঁর জোরালো ও কোনাকুনি শট ইংলিশ ডিফেন্ডারদের ব্লক এতিম করে জালের ঠিকানা খুঁজে নেয়। পিকফোর্ড ডানদিকে ঝাঁপিয়েও বলের নাগাল পাননি। সমতায় ফেরার পর আর্জেন্টিনা যেখানে ম্যাচ জয়ের নেশায় বুঁদ হয়ে ওঠে, ইংল্যান্ড সেখানে মানসিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়ে।
নির্ধারিত সময়ের ঠিক শেষ মিনিটে আসে সেই অন্তিম মুহূর্ত। ডান প্রান্ত থেকে নিখুঁত ও মাপা এক ক্রস বাড়ান অধিনায়ক লিওনেল মেসি। ইংলিশ ডিফেন্ডাররা শূন্যে লাফিয়েও সেই বল ক্লিয়ার করতে ব্যর্থ হন, আর ঠিক পেছনেই ওত পেতে থাকা লাউতারো মার্টিনেজ দুর্দান্ত এক হেডে বল জালে জড়িয়ে দেন। নিস্তব্ধ হয়ে যায় পুরো ইংলিশ শিবির। মাত্র সাত মিনিটের ব্যবধানে নিশ্চিত জয় হাতছাড়া হয়ে স্বপ্নভঙ্গ হয় টুখেলের শিষ্যদের।
রেফারি ইনজুরি সময় হিসেবে ৯ মিনিট দিলেও ছন্নছাড়া ইংল্যান্ড আর ম্যাচে ফেরার মতো কোনো আক্রমণই শানাতে পারেনি। উল্টো ৩৯ বছর বয়সেও মাঠ জুড়ে জাদুকরী ফুটবল খেলা মেসি শেষ মুহূর্তে আরও কিছু গোলের সুযোগ তৈরি করেছিলেন। ক্যারিয়ারে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ খেলতে নেমেই জোড়া অ্যাসিস্টে দলকে ফাইনালে তুললেন এই মহানায়ক। ফকল্যান্ড যুদ্ধ কিংবা ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ ইতিহাসের কারণে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এই জয় আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে যোগ করল এক অবিস্মরণীয় রূপকথা, আর সেই সাথে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার কখনো না হারার অজেয় রেকর্ডটি অক্ষত থাকল।
