ড্রয়ের হতাশায় শুরু হলো ব্রাজিলের বিশ্বকাপ মিশন

বিশ্বকাপ ফুটবলের আসরে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে ল্যাটিন আমেরিকার শক্তিশালী দল ব্রাজিল। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ‘সি’ গ্রুপের এই হাইভোল্টেজ ম্যাচে মরক্কোর মুখোমুখি হয়েছিল পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নেরা। তবে মাঠের লড়াইয়ে আফ্রিকান পরাশক্তি মরক্কোর রক্ষণভাগ ও আক্রমণভাগের চমৎকার সমন্বয়ের সামনে পূর্ণ পয়েন্ট তুলে নিতে ব্যর্থ হয়েছে সেলেসাওরা। ১-১ গোলের সমতায় শেষ হওয়া এই ম্যাচের প্রথমার্ধেই দুটি গোল সম্পন্ন হয়। দ্বিতীয়ার্ধে দুই দলই জয়সূচক গোলের জন্য একাধিক আক্রমণ চালালেও শেষ পর্যন্ত ড্রয়ের সন্তুষ্টি নিয়েই মাঠ ছাড়তে হয়েছে দুই ফুটবল শক্তিকে।

মাঠের লড়াই: মরক্কোর দাপট ও ব্রাজিলের প্রতিরোধ

ম্যাচের শুরু থেকেই দলের প্রধান তারকা নেইমারকে ছাড়া মাঠে নামা ব্রাজিলীয় দলটিকে কিছুটা অগোছালো ও ছন্দহীন মনে হচ্ছিল। এই সুযোগে মরক্কো ম্যাচের প্রথম মিনিট থেকেই সুশৃঙ্খল এবং আক্রমণাত্মক ফুটবল প্রদর্শন করতে শুরু করে। খেলার মাত্র ষষ্ঠ মিনিটে গোলের একটি অত্যন্ত সহজ সুযোগ তৈরি করে আফ্রিকার এই প্রতিনিধিরা। মাঠের বাম প্রান্ত দিয়ে ছোট ছোট পাসের নিখুঁত সমন্বয়ে ব্রাজিলের রক্ষণভাগে ঢুকে পড়ে তারা। দলের তরুণ মিডফিল্ডার বেনজামিন এল আইনুই ব্রাজিলের ডি-বক্সের ভেতরে বল পেয়ে গোলপোস্ট লক্ষ্য করে একটি জোরালো শট নেন। তবে ব্রাজিলের রক্ষণভাগের বিশ্বস্ত খেলোয়াড় গ্যাব্রিয়েল মাগালহায়েস শেষ মুহূর্তে দারুণভাবে সেই শট প্রতিহত করে নিশ্চিত গোলের হাত থেকে দলকে রক্ষা করেন।

শুরুর দিকের এই প্রাথমিক চাপ সামলে নিয়ে ব্রাজিল ধীরে ধীরে খেলায় ফেরার চেষ্টা চালায়। একটি চমৎকার পাল্টা আক্রমণ থেকে মরক্কোর ডি-বক্সে গোল করার সুযোগ পেয়েছিলেন ব্রাজিলের স্ট্রাইকার ইগর থিয়াগো। সতীর্থের বাড়ানো একটি শূন্যে ভাসানো পাসে সঠিক অবস্থানে থেকেও তিনি বলের সাথে নিজের মাথার সংযোগ ঘটাতে পুরোপুরি ব্যর্থ হন। ব্রাজিল যখন ধীরে ধীরে মাঠের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই ম্যাচের ২১তম মিনিটে রিয়াল মাদ্রিদের তারকা ফুটবলার ব্রাহিম দিয়াজের একটি দর্শনীয় পাস থেকে বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে মরক্কোকে এগিয়ে দেন ফরোয়ার্ড ইসমায়েল সাইবারি।

ভিনিসিয়ুসের ঐতিহাসিক গোল ও সমতা

এক গোল খেয়ে পিছিয়ে পড়ার পর সমতায় ফিরতে মরক্কোর রক্ষণভাগে একের পর এক আক্রমণ চালাতে থাকে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নেরা। গোল হজমের ঠিক ১১ মিনিট পর, অর্থাৎ ম্যাচের ৩২তম মিনিটে একক নৈপুণ্যে ব্রাজিলকে সমতায় ফেরান দলের অন্যতম সেরা তারকা ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। মাঠের বাম প্রান্ত দিয়ে মরক্কোর রক্ষণভাগের খেলোয়াড়কে চমৎকার ড্রিবলিংয়ে পরাস্ত করে ডি-বক্সের ভেতর ঢুকে তিনি একটি বুলেট গতির শট নেন। মরক্কোর অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনো বলের গতিপথের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়েও সেই শট আটকাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হন। ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী হলুদ জার্সিতে এটি ছিল ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের ৫০তম আন্তর্জাতিক গোল।

ম্যাচের মূল ঘটনা ও পরিসংখ্যানের বিবরণ

ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মোড়, খেলোয়াড়দের ভূমিকা এবং সার্বিক পরিসংখ্যান নিচে টেবিলের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:

বিশেষ বিবরণসংশ্লিষ্ট তথ্য ও উপাত্ত
খেলার ধরন ও গ্রুপবিশ্বকাপ ফুটবল, ‘সি’ গ্রুপ
খেলার মাঠ ও স্থানমেটলাইফ স্টেডিয়াম, নিউ জার্সি, যুক্তরাষ্ট্র
মরক্কোর প্রথম গোলইসমায়েল সাইবারি (২১তম মিনিট)
মরক্কোর গোল সহায়তাকারীব্রাহিম দিয়াজ
ব্রাজিলের সমতাসূচক গোলভিনিসিয়ুস জুনিয়র (৩২তম মিনিট)
ভিনিসিয়ুসের মাইলফলকআন্তর্জাতিক ফুটবলে ৫০তম গোল
ব্রাজিল দলের প্রধান কোচকার্লো আনচেলত্তি
ব্রাজিলের গোলরক্ষকঅ্যালিসন বেকার
মরক্কোর গোলরক্ষকইয়াসিন বুনো
ম্যাচের চূড়ান্ত ফলব্রাজিল ১ – ১ মরক্কো (পয়েন্ট ভাগাভাগি)

দ্বিতীয়ার্ধের রোমাঞ্চ ও শেষ মুহূর্তের উত্তেজনা

১-১ গোলের সমতা নিয়ে প্রথমার্ধের খেলা শেষ হওয়ার পর দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকেই দুই দল তাদের রক্ষণভাগকে শক্তিশালী রেখে আক্রমণে যাওয়ার কৌশল গ্রহণ করে। তবে প্রথম ভাগের তুলনায় দ্বিতীয়ার্ধে মরক্কোর আক্রমণের গতি কিছুটা ম্লান ছিল। এই সময়ে কার্লো আনচেলত্তির শীর্ষরাই মাঠের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বেশি ভালো খেলার এবং গোল করার চেষ্টা চালায়।

তবে ম্যাচের একদম শেষ মুহূর্তে, অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ের পর যোগ করা সময়ের ৯৯তম মিনিটে মরক্কোর অধিনায়ক আশরাফ হাকিমির দল ব্রাজিলের রক্ষণভাগে তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টি করে। মরক্কোর মিডফিল্ডার বেনজামিন এল আইনুইয়ের একটি দূরপাল্লার শক্তিশালী শট ব্রাজিলের বিশ্বস্ত গোলরক্ষক অ্যালিসন বেকার অত্যন্ত দক্ষতার সাথে প্রতিহত করেন। অ্যালিসন বেকার সেই যাত্রা বলটি রক্ষা না করলে ম্যাচের ফলাফল ব্রাজিলের পক্ষে মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারত। শেষ পর্যন্ত ম্যাচের যোগ করা সময়সহ অবশিষ্ট মিনিটে আর কোনো গোল না হওয়ায় ১-১ ব্যবধানের ড্রয়ের মধ্য দিয়েই মাঠ ছাড়ে গ্রুপ ‘সি’-এর দুই শক্তিশালী প্রতিপক্ষ ব্রাজিল ও মরক্কো।

Leave a Comment