
দেশে ফিরলে কোরিয়া ফুটবল দলকে ‘ডিম থেরাপি’ দেওয়ার প্রস্তুতি
বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেওয়ার পর দক্ষিণ কোরিয়া ফুটবল দল যখন স্বদেশের মাটিতে পা রাখার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন তাদের জন্য ট্রফির চেয়েও বড় চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিমানবন্দরে অপেক্ষারত ক্ষুব্ধ সমর্থকদের জনরোষ। দলটির প্রধান কোচ হং মিউং বোর ভুল কৌশল, তারকা খেলোয়াড়দের মাঠের ব্যর্থতা এবং ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (কেএফএ) দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এশিয়ান এই ফুটবল পরাশক্তিকে এক নজিরবিহীন সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে বাঁচা-মরার ম্যাচে দলের সবচেয়ে বড় ভরসা সন হিউং মিনকে প্রথমার্ধে বেঞ্চে বসিয়ে রাখার কোচের সিদ্ধান্তটি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না সমর্থকেরা।
কোরিয়ান ফুটবল সংস্কৃতির একটি অন্ধকার ও বিতর্কিত দিক হলো ‘ডিম থেরাপি’। এটি এমন এক ধরণের সামাজিক প্রতিবাদ, যেখানে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করা বা হতাশাজনক পারফরম্যান্সের দায়ে অভিযুক্ত তারকা বা কর্মকর্তাদের জনসমক্ষে পচা ডিম, বালিশ কিংবা ঐতিহ্যবাহী কোরিয়ান ক্যান্ডি বা মিষ্টি ছুড়ে মারা হয়। বাইরে থেকে একে স্রেফ সমর্থকদের উগ্রতা মনে হলেও, কোরিয়ান সমাজে এর গভীর সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক অর্থ রয়েছে। এই ধরণের আচরণকে জনসমক্ষে চরম লজ্জাজনক, অপমানসূচক এবং সামাজিক মর্যাদাহানির প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। অতীতে ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপ এবং ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপের পরও যখন দল প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়ে ইনচিওন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেছিল, তখনো তাদের এই একই পৈশাচিক প্রতিবাদের মুখোমুখি হতে হয়েছিল।
চলতি ২০২৬ বিশ্বকাপে দক্ষিণ কোরিয়ার শুরুটা কিন্তু বেশ আশাব্যঞ্জক ছিল। গ্রুপ ‘এ’-এর প্রথম ম্যাচে চেক প্রজাতন্ত্রকে ২-১ গোলে হারিয়ে তারা নকআউটের শক্ত দাবিদার হয়ে ওঠে। তবে এরপরই মেক্সিকোর কাছে ১-০ গোলের হার এবং সবশেষ দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে ১-০ ব্যবধানের নাটকীয় পরাজয় দলটিকে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে দেয়। তৃতীয় স্থান অর্জনকারী দলগুলোর চূড়ান্ত সমীকরণে ১০ম স্থানে থাকায় কোনো মিরাকলও তাদের বাঁচাতে পারেনি। মাঠের এই ব্যর্থতা যখন কেএফএ-এর ভেতরের প্রশাসনিক দুর্নীতির খবরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, তখন সমর্থকদের রাগ বিমানবন্দরে আছড়ে পড়ার জন্য রূপ নিয়েছে এক গণঅসন্তোষে।
এই চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সামাল দিতে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রশাসন ও ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন এবার ইনচিওন বিমানবন্দরে এক নজিরবিহীন নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের হাত থেকে খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের সুরক্ষিত রাখতে তৈরি করা হচ্ছে বিশেষ ব্যারিকেড ও টার্মিনাল প্রোটোকল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়লে সাধারণ টার্মিনাল পুরোপুরি এড়িয়ে দল ও কর্মকর্তাদের বিমানবন্দর থেকে বের করতে বিকল্প ও গোপন এক্সিট রুট ব্যবহারের পরিকল্পনাও টেবিলে রাখা হয়েছে। তবে শুধু ডিমের আঘাত বা মিষ্টির অপমান নয়, দেশে ফেরার পর গণমাধ্যমের তীক্ষ্ণ প্রশ্ন এবং দেশজুড়ে যে তীব্র সামাজিক মর্যাদাহানির আশঙ্কা রয়েছে, সেটিই এখন কোরিয়ান ফুটবলার ও থিংক-ট্যাঙ্কের জন্য সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক চাপ। তীব্র জনরোষের এই থমথমে আবহে দক্ষিণ কোরিয়া ফুটবল দল শেষ পর্যন্ত কীভাবে নিজ দেশে পা রাখে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।