
পর্তুগাল ইতিহাসের সেরা দল হলেও আমাদের মিডফিল্ডই সেরা: রদ্রি
ফিফা বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর মঞ্চে আজ ফুটবলপ্রেমীরা সাক্ষী হতে যাচ্ছেন এক মহাকাব্যিক লড়াইয়ের। কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার এই মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে মুখোমুখি হচ্ছে দুই ইউরোপীয় পরাশক্তি স্পেন ও পর্তুগাল। মাঠের যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই কথার লড়াইয়ে উত্তাপ ছড়িয়ে দিলেন স্প্যানিশ অধিনায়ক রদ্রি। তাঁর সাফ কথা, পর্তুগিজদের মিডফিল্ড যতই শক্তিশালী হোক না কেন, স্পেনের মাঝমাঠই বিশ্বের সেরা।
যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে দুই দলের এই দ্বৈরথ আদতে তারকাখচিত দুই মাঝমাঠের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের লড়াই। একদিকে ব্যালন ডি’অর জয়ী রদ্রি, তরুণ তুর্কি পেদ্রি এবং দানি ওলমোদের নিয়ে গড়া স্পেনের শৈল্পিক মিডফিল্ড; অন্যদিকে ভিতিনিয়া, জোয়াও নেভেস এবং ব্রুনো ফার্নান্দেসের মতো বিশ্বমানের ত্রয়ী নিয়ে গঠিত পর্তুগালের শক্তিশালী দুর্গ। দুই দলের ফুটবলারদের সাম্প্রতিক ফর্ম এই ম্যাচকে নিয়ে গেছে এক ভিন্ন উচ্চতায়।
এই দুই প্রতিবেশী দেশের ফুটবলীয় শত্রুতা বেশ পুরোনো। ফুটবলপ্রেমীদের মনে এখনও টাটকা ২০২৫ সালের উয়েফা নেশনস লিগের ফাইনালের স্মৃতি। সেই শ্বাসরুদ্ধকর ফাইনালে নির্ধারিত সময়ের খেলা ২-২ গোলে সমতায় শেষ হয়েছিল। পরবর্তীতে টাইব্রেকারের ভাগ্যপরীক্ষায় স্পেনকে কাঁদিয়ে শিরোপা উল্লাসে মেতেছিল ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পর্তুগাল। ফলে স্প্যানিশদের সামনে আজ যেমন মধুর প্রতিশোধের সুযোগ, পর্তুগালের সামনে তেমনই আধিপত্য ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ।
রোববার ডালাসের ঐতিহাসিক কটন বোল স্টেডিয়ামে দলের অনুশীলনে নামার আগে সংবাদ সম্মেলনে হাজির হয়েছিলেন রদ্রি। পর্তুগালকে সমীহ করে এই স্প্যানিশ মিডফিল্ডার বলেন, “ওরা সব সময়ই কঠিন প্রতিপক্ষ। ওরা আমাদের খুব ভালো করে চেনে, আমরাও ওদের শক্তির জায়গাগুলো জানি। আমার মতে, পর্তুগাল তাদের ইতিহাসের সম্ভবত সর্বকালের সেরা দল নিয়ে এবার বিশ্বকাপে এসেছে। স্বাভাবিকভাবেই পরের রাউন্ডে যেতে হলে আমাদের মাঠের সেরা ফুটবলটাই খেলতে হবে।”
তবে প্রতিপক্ষকে প্রশংসায় ভাসালেও নিজের আত্মবিশ্বাসে বিন্দুমাত্র চির ধরেনি স্প্যানিশ অধিনায়কের। পর্তুগালের মাঝমাঠের ত্রয়ীকে বিশ্বের সেরা বলা যায় কি না— সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে রদ্রি বেশ দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, “আমার কাছে নিজের দল এবং নিজের মিডফিল্ডই সেরা। ওদের দলে একঝাঁক তারকা ও শীর্ষ সারির খেলোয়াড় রয়েছে, যারা দলগতভাবে দারুণ খেলে। ওদের প্রায় সব পজিশনেই শক্তি আছে, তবে আমরা মাঠে প্রমাণ করতে চাই যে আমরাই সেরা।”
চলতি বিশ্বকাপে স্পেনের রক্ষণভাগ এখন পর্যন্ত এক অভেদ্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত কোনো গোল হজম করেনি তারা। সবশেষ রাউন্ড অব ৩২-এর ম্যাচেও অস্ট্রিয়াকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে নিজেদের শক্তির জানান দিয়েছে লুইস দে লা ফুয়েন্তের শিষ্যরা। বিপরীতে, পর্তুগালকে শেষ ষোলোতে আসতে বেশ কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ম্যাচে ক্রোয়েশিয়াকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে তারা নকআউট পর্বের টিকিট কেটেছে।
দলের এই ধারাবাহিক পারফরম্যান্স নিয়ে রদ্রি বলেন, “আমরা আরও ভালো করতে পারি। এই ধরনের বড় টুর্নামেন্টে খেলার অভিজ্ঞতা আমাদের রয়েছে। আমরা জানি ঠিক কোন মুহূর্তে জ্বলে উঠতে হবে। গ্রুপ পর্বে মূলত দল গুছিয়ে নেওয়া এবং কাঙ্ক্ষিত ফল বের করে আনাটা জরুরি ছিল। তবে এখন নকআউট পর্বে এসে স্পেনের আসল রূপ দেখা যাচ্ছে। সামনে বড় কিছু হতে চলেছে।”
২০২৪ সালে ফুটবল বিশ্বের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সম্মাননা ‘ব্যালন ডি’অর’ জয়ের পর থেকেই সময়টা খুব একটা ভালো যাচ্ছিল না রদ্রির। চোটের কারণে মাঠের বাইরে কাটাতে হয়েছে বেশ কিছুদিন, যার প্রভাব পড়েছিল ফর্মেও। এমনকি এই বিশ্বকাপের শুরুতে স্প্যানিশ গণমাধ্যমে তাঁকে নিয়ে কিছুটা সমালোচনাও হয়েছিল। তবে সব সমালোচনাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এই মিডফিল্ডার জানিয়েছেন, তিনি এখন পুরোপুরি চেনা ছন্দে ফিরছেন।
নিজের শারীরিক অবস্থা নিয়ে রদ্রি বলেন, “আমি এখন শতভাগ ফিট বোধ করছি। ম্যাচের ৯০ মিনিট জুড়েই আমার পারফরম্যান্সের উন্নতি হচ্ছে। আর আমি জানি, আসল এবং কঠিন ম্যাচগুলো এখনই শুরু হচ্ছে। এটা স্পষ্ট যে আমার এখনও আরও উন্নতি করার জায়গা আছে। টুর্নামেন্ট যত সামনের দিকে এগোবে, আমাদের পারফরম্যান্সের ধার তত বাড়বে। পর্তুগালের বিপক্ষে আমাদের সেরাটাই দিতে হবে।”
অধিনায়কের সুরেই সুর মিলিয়েছেন স্পেনের প্রধান কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। নিজের শিষ্যদের ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “পর্তুগালের কোচ রবার্তো মার্তিনেসও নিশ্চয়ই তাঁর খেলোয়াড়দের নিয়ে আমার মতোই ভাবেন। আমি জানি প্রতিপক্ষ দল হিসেবে ওরা অসাধারণ, কিন্তু আমি মনে করি আমার খেলোয়াড়রাই বিশ্বের সেরা।”
দুই দলের এই কথার লড়াই এবং মাঠের পরিসংখ্যান আভাস দিচ্ছে এক আগুনে ম্যাচের। কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করার এই হাইভোল্টেজ লড়াইটি শুরু হবে আজ বাংলাদেশ সময় রাত ১টায়। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন ডালাসের মাঠে দুই দলের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই দেখার জন্য।