
ফকল্যান্ডের স্মৃতি ও ম্যারাডোনার জাদুতে ইংল্যান্ড বধের ছকে আর্জেন্টিনা
ফুটবল ইতিহাসের ধুলোবালি ঘেঁটে যদি আমরা সেরা কোনো টুর্নামেন্টের খোঁজ করি, তবে ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপের নাম সবার ওপরে থাকবে। ডিয়েগো ম্যারাডোনা ও মেক্সিকোর সেই সোনালি বিশ্বকাপ যেন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। ফুটবল বিশ্বকে তিনি একা হাতে দেখিয়েছিলেন কীভাবে শুধু জাদুকরী ড্রিবলিং আর ক্ষুরধার বুদ্ধিমত্তা দিয়ে একটি মাঝারি মানের দলকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করা যায়।
মহামঞ্চের সেই জয়ের পথে সবচেয়ে স্মরণীয় যুদ্ধটি ছিল ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল। ১৯৮২ সালের রক্তক্ষয়ী ‘ফকল্যান্ড যুদ্ধের’ মাত্র চার বছর পর দুই দেশের এই মাঠের লড়াইটি শুধু ফুটবলের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। সেটি রূপ নিয়েছিল তীব্র রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে। আজ রাতে যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে আরেকটি ব্লকবাস্টার সেমিফাইনাল দ্বৈরথে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে এই দুই ফুটবল পরাশক্তি।
ঈশ্বরের স্পর্শ ও শতাব্দীর সেরা গোলের সেই দুপুর
মেক্সিকোর আজটেকা স্টেডিয়ামে সেদিন ম্যারাডোনার জোড়া গোলে ২-১ ব্যবধানে জিতেছিল ল্যাটিন আমেরিকার দেশটি। ম্যাচের প্রথম গোলটি করার সময় ম্যারাডোনা তাঁর হাত ব্যবহার করেছিলেন, যা রেফারির চোখ এড়িয়ে জালে জড়ায়। ম্যাচ শেষে এই নিয়ে বিতর্ক শুরু হলে ম্যারাডোনা হাস্যোজ্জ্বল মুখে উত্তর দিয়েছিলেন—গোলটি কিছুটা ডিয়েগোর মাথা আর কিছুটা ‘ঈশ্বরের হাতের’ ছোঁয়ায় হয়েছে।
তবে সেই বিতর্কের রেশ কাটতে না কাটতেই বিশ্ববাসী দেখেছিল শতাব্দীর সেরা অলৌকিক দৃশ্য। মাঝমাঠ থেকে বল পায়ে একাই দৌড় শুরু করেন ম্যারাডোনা। গতির ঝড় তুলে একে একে ইংল্যান্ডের পাঁচজন বিশ্বমানের ডিফেন্ডার ও গোলরক্ষক পিটার শিলটনকে বোকা বানিয়ে বল জড়ান জালে। শতাব্দীর সেরা এই গোলটি এবং সেই জয় আর্জেন্টিনার মানুষের কাছে ফকল্যান্ড যুদ্ধে পরাজয়ের ক্ষতে এক টুকরো মধুর প্রলেপ দিয়ে দিয়েছিল।
ম্যারাডোনার জাদুকরী ভিডিও ক্লিপই এখন ড্রেসিংরুমের টনিক
কয়েক দশক পর আবারও ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়ার আগে আর্জেন্টিনার ড্রেসিংরুমে এখন ডিয়েগোর সেই অকুতোভয় ফুটবল চেতনারই চর্চা চলছে। আলবিসেলেস্তেদের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার অ্যালেক্সিস ম্যাক আলিস্টার জানান, গত কয়েক দিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ম্যারাডোনার সেই বিখ্যাত ম্যাচের কাটছাঁট করা ভিডিওগুলো তাঁদের মানসিকভাবে দারুণভাবে চাঙ্গা করে তুলেছে।
লিভারপুলে খেলা এই তারকা খেলোয়াড় বলেন:
“ডিয়েগো ম্যারাডোনা আমাদের দেশের জন্য কেবল একজন কিংবদন্তি ফুটবলার নন, তিনি আমাদের ফুটবল আবেগের জাতীয় প্রতীক। ইন্টারনেট দুনিয়ায় ঘুরে বেড়ানো সেই মহানায়কের লড়াইয়ের ক্লিপগুলো আমাদের বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে ডিয়েগো আসলে আমাদের জন্য কী ছিলেন এবং আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে জড়ানোর মাহাত্ম্য ঠিক কতখানি। আমরা আশা করি, ১৯৮৬ সালের সেই ঐতিহাসিক দলটা যে বীরত্ব দেখিয়েছিল, আজ আমরাও ঠিক তেমন কিছু অর্জন করে মাঠ ছাড়তে পারব।”
মেসির জাদুতে ম্যারাডোনাকে ফিরে পাওয়ার আশা
ম্যাক আলিস্টার অকপটে স্বীকার করেন যে, ম্যারাডোনা ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগের বিরুদ্ধে যে একক আধিপত্য দেখিয়েছিলেন, আধুনিক ফুটবলে কোনো সাধারণ ফুটবলারের পক্ষে সেই অতিমানবীয় পারফরম্যান্সের পুনরাবৃত্তি করা সম্ভব নয়। তবে তিনি বিশ্বাস করেন, বর্তমান ফুটবল বিশ্বে একজন মানুষের পক্ষেই এই অসাধ্য সাধন করা সম্ভব—আর তিনি হলেন ফুটবল জাদুকর লিওনেল মেসি।
আর্জেন্টাইন শিবিরের আশা, আটলান্টার গ্যালারিতে যখন হাজারো নীল-সাদা সমর্থকের গর্জন প্রতিধ্বনিত হবে, তখন মাঠের বুকে মেসির মাঝে ছায়া হয়ে ফিরে আসবেন খোদ ডিয়েগো ম্যারাডোনা। ডিয়েগোর সেই অকুতোভয় ফুটবল দর্শনকে বুকে ধারণ করেই আজ রাতের এই মহাদ্বৈরথে ফাইনালে ওঠার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামছে আর্জেন্টিনা।