
বিদায়ের ইঙ্গিত রোনালদোর, স্পেনের ম্যাচটিকেই শেষ করতে চান না সিআরসেভেন
বয়স ৪০-এর কোটা পেরিয়েছে আগেই। তাঁর সমসাময়িক প্রায় সব ফুটবলারই বুটজোড়া তুলে রেখে এখন হয়তো কোট-টাই পরে টিভি পর্দায় ধারাভাষ্য দিচ্ছেন বা ম্যাচের চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন। কিন্তু ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। এই বয়সেও তিনি সবুজ মাঠে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন, নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপে এসেও সাফল্যের সঙ্গে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন জাতীয় দলকে। তবে বিশ্বকাপের মহাগুরুত্বপূর্ণ নকআউট পর্বে স্পেনের মুখোমুখি হওয়ার আগে এবার সত্যিই বুটজোড়া তুলে রাখার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়ে রাখলেন পর্তুগিজ মহানায়ক।
স্পেনের বিপক্ষে হাইভোল্টেজ ম্যাচের আগে সংবাদ সম্মেলনে অবধারিতভাবেই উঠেছিল তাঁর ভবিষ্যতের প্রশ্ন। এই বিশ্বকাপ শেষেই তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানাবেন কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে পর্তুগাল অধিনায়ক স্বভাবসুলভ দৃঢ়তায় বলেন, “আমি যখন ইচ্ছা করব, তখনই অবসর নেব। আপনাদের বা অন্য কারও ইচ্ছা অনুযায়ী আমার ক্যারিয়ারের সিদ্ধান্ত হবে না। এই মুহূর্তে দলের জয়ই আমার একমাত্র এবং প্রধান চিন্তা।”
নিজের অবসর নিয়ে চারপাশের গুঞ্জনকে একপাশে সরিয়ে রাখলেও রোনালদো এটা নিশ্চিত করেছেন যে, বিশ্বমঞ্চে এটাই তাঁর শেষ নাচ। অবসরের আবহ তৈরি করে তিনি জানান, “যতটা পারছি এই টুর্নামেন্ট উপভোগ করার চেষ্টা করছি। কারণ, নিশ্চিতভাবেই এটাই আমার শেষ বিশ্বকাপ। আশা করি, স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচটাই বিশ্বমঞ্চে আমার শেষ ম্যাচ হবে না।” কদিন আগে রোনালদোর বোন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেছিলেন যে এই বিশ্বকাপের পর আর জাতীয় দলে দেখা যাবে না তাঁকে। তবে রোনালদো স্পষ্ট করে দিয়েছেন, আবেগের বশে বা পারিবারিক চাপে কোনো সিদ্ধান্ত তিনি নেবেন না।
সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, ২০৩০ সালের বিশ্বকাপের আসর বসতে যাচ্ছে পর্তুগালের মাটিতে। স্পেন ও মরক্কোর সঙ্গে যৌথভাবে বিশ্বকাপের শতবর্ষপূর্তির এই আসর আয়োজন করবে তাঁর নিজ দেশ। ২০৩০ সালে রোনালদোর বয়স গিয়ে দাঁড়াবে ৪৫-এ। ফুটবলপ্রেমীদের মনে একটা সুপ্ত আশা ছিল, ঘরের মাঠের বিশ্বকাপে খেলে ফুটবল ইতিহাস তৈরি করবেন তিনি। যদি সেই বয়সে তিনি খেলতেন, তবে বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে এক অনন্য রেকর্ড গড়তেন।
কিন্তু রোনালদো বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে আগেই থামতে চান। মনের জানালা খুলে এই কিংবদন্তি বলেন, “একদিন না একদিন তো বুটজোড়া তুলে রাখতেই হবে। সত্যি বলতে, স্পেনের বিপক্ষে যা–ই হোক না কেন, আমি মাঠ ছাড়ব নিজেকে হাজার ভাগ উজাড় করে দিয়ে। ফুটবলকে আমি আমার জীবনের সবটা দিয়েছি, আর বেশি কিছু চাওয়ার নেই। আমি ফুটবল খেলি কারণ এই খেলাটাকে মনেপ্রাণে ভালোবাসি। ভালোবাসা না থাকলে এই বয়সে এভাবে প্রতিদিন মাঠে নেমে পারফর্ম করা সম্ভব নয়। এই বিশ্বকাপেও তো ৪ ম্যাচে ৩টি গোল করলাম। পারফরম্যান্স তো খারাপ না, তাই না?”
চলতি বিশ্বকাপে রোনালদোর ফর্ম সত্যিই দুর্দান্ত। গ্রুপ পর্বে উজবেকিস্তানের বিপক্ষে গোল করে ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে টানা ৬টি বিশ্বকাপে গোল করার অনন্য কীর্তি গড়েন তিনি। এর পাশাপাশি নকআউট পর্বে গোল করতে না পারার যে দীর্ঘ আক্ষেপ তাঁর ক্যারিয়ারে ছিল, সেটিও ঘুচিয়েছেন এবারের আসরে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে গোল করে।
শেষ ষোলোর লড়াইয়ে পর্তুগালের প্রতিপক্ষ স্পেন। এই স্প্যানিশদের বিপক্ষে রোনালদোর অতীত রেকর্ড চোখধাঁধানো। ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে স্পেনের রক্ষণভাগ চূর্ণ-বিচূর্ণ করে হ্যাটট্রিক করেছিলেন তিনি। এমনকি ২০২৫ সালের নেশনস কাপের ফাইনালেও স্পেনের জাল কাঁপিয়েছিলেন এই ফরোয়ার্ড। বিদায়ের অবাধ্য সুর ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজিয়ে স্পেনের বিপক্ষে মাঠে নামার আগে রোনালদো যে নিজেকে আরও একবার ফুটবল বিশ্বমঞ্চে প্রমাণ করতে মুখিয়ে আছেন, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। পর্তুগাল সমর্থকেরা এখন এটাই প্রার্থনা করছেন, যেন স্পেনের প্রাচীর ভেঙে রোনালদোর বিদায়ী বিশ্বকাপ যাত্রা আরও দীর্ঘ হয়।