
ব্রাজিলের সোনালী অধ্যায়ের সমাপ্তি: আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানালেন নেইমার
ব্রাজিলের হয়ে দীর্ঘ ১৬ বছরের বর্ণাঢ্য পথচলার আনুষ্ঠানিক ইতি টেনে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানালেন দেশটির সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা নেইমার জুনিয়র। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি বহু স্মরণীয় মুহূর্ত উপহার দিয়েছেন। ২০২৬ বিশ্বকাপ থেকে সেলেসাওদের হতাশার বিদায়ের পর থেকেই তার ভবিষ্যৎ নিয়ে গুঞ্জন চলছিলো। সম্প্রতি কোপা সুদামেরিকানায় ভেনিজুয়েলার ক্লাব ইউনিভার্সিদাদ সেন্ট্রালের বিপক্ষে সান্তোসের ৪-২ ব্যবধানে জয়ের পর সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবসরের ঘোষণা দেন ৩৪ বছর বয়সি এই ফরোয়ার্ড।
পাঁচবারের বিশ্বজয়ী ব্রাজিলের জার্সিতে সদ্য সমাপ্ত বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর পর্বে নরওয়ের কাছে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেওয়ার ম্যাচটিই শেষ পর্যন্ত তার জীবনের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ হিসেবে থেকে গেল। দীর্ঘ এই ক্যারিয়ারে নেইমার দেশের হয়ে মাঠে নামার সময় সবসময় নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছেন। অবসরের ঘোষণা দেওয়ার সময় তিনি জানান, তার মনে কোনো আক্ষেপ নেই। কারণ হলুদ জার্সির সম্মান রক্ষা করতে তিনি কখনোই পিছপা হননি।
ম্যাচ শেষে বিশ্বখ্যাত ক্রীড়া মাধ্যম গোল ডটকম (Goal.com)-এর বরাতে নেইমার স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, আন্তর্জাতিক ফুটবল অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে। তিনি বলেন, দেশের হয়ে ইতিহাস গড়ার আনন্দ তার আজীবন মনে থাকবে। দেশের পতাকার জন্য তিনি নিজের রক্ত ও ঘাম ঝরিয়েছেন। তবে বর্তমান সময়ে এসে তার মনে হয়েছে এটাই সরে দাঁড়ানোর সঠিক সময়।
জাতীয় দল ছাড়ার পর নেইমারের সমস্ত মনোযোগ এখন পুরোপুরি ক্লাব ফুটবলে নিজের শৈশবের ক্লাব সান্তোসের প্রতি। সম্প্রতি সান্তোসের একটি ম্যাচের পর ড্রেসিংরুমে দলের তরুণ সতীর্থদের নিয়ে তার কঠোর সমালোচনা করা নিয়ে বেশ কিছু গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। অনেকেই দাবি করেছিলেন যে তিনি সতীর্থদের ভয় দেখিয়েছেন। তবে ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে এই সমস্ত অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেন অভিজ্ঞ এই তারকা।
তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, ম্যাচ শেষের ওই মন্তব্যগুলো সতীর্থদের দমিয়ে রাখার জন্য ছিল না, বরং দলের পারফরম্যান্সের মান আরও উঁচুতে নেওয়ার তাগিদ থেকেই তিনি কথাগুলো বলেছিলেন। অধিনায়ক হিসেবে দলের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেওয়া এবং তাদের আরও সতর্ক করার দায়িত্ব তার রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। মাঠের বাইরের নানা ধরনের বিতর্ক এবং আলোচনা অনেক সময় খেলোয়াড়দের মানসিক শান্তি নষ্ট করে, যা নিয়ে তিনি কিছুটা হতাশাও প্রকাশ করেন।
মাঠের বাইরের এসব বিতর্ককে পেছনে ফেলে সান্তোসের হয়ে মাঠে নিজের সেরাটা দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। ইউনিভার্সিদাদ সেন্ট্রালের বিপক্ষে সান্তোসের ৪-২ গোলের জয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন এই অভিজ্ঞ ফরোয়ার্ড। এই দারুণ জয়ের সুবাদে ব্রাজিলীয় ক্লাবটি কোপা সুদামেরিকানার নকআউট পর্বে অর্থাৎ শেষ ষোলোতে নিজেদের জায়গা পাকা করেছে। পরবর্তী রাউন্ডে তারা মাঠে নামবে ইকুয়েডরের ক্লাব ম্যাকারার বিপক্ষে।
২০০৯ সালে ব্রাজিলের সিনিয়র জাতীয় দলের হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিষেক ঘটেছিল এই প্রতিভাবান তারকার। এরপর দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি সেলেসাও আক্রমণভাগের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ক্লাব ক্যারিয়ারে বার্সেলোনা ও পিএসজির মতো বিশ্বমানের ক্লাবে খেলার পাশাপাশি তিনি দেশের জার্সিতে সবসময় ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। চারবার বিশ্বকাপ ফুটবলের মঞ্চে প্রতিনিধিত্ব করার পাশাপাশি তিনি কোপা আমেরিকা এবং অলিম্পিক গেমসেও দেশের হয়ে আলো ছড়িয়েছেন। তার এই বিদায়ের মাধ্যমে ব্রাজিলীয় ফুটবলের একটি ঐতিহাসিক ও সোনালী অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল, যা ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে দীর্ঘদিন অমলিন হয়ে থাকবে।