
ল্যাবের অ্যাপ্রন ছেড়ে ডালাসের মাঠে: ফ্রান্স-স্পেন ম্যাচের রেফারি রসায়নের অধ্যাপক
বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনালের মহারণে মুখোমুখি হচ্ছে ইউরোপের দুই পরাশক্তি ফ্রান্স ও স্পেন। তবে মাঠের তারকাদের ছাপিয়ে এই মুহূর্তে ফুটবল দুনিয়ায় সবচেয়ে আলোচিত চরিত্র ম্যাচের প্রধান রেফারি। ফুটবলের সবুজ ঘাসে বাঁশি হাতে খেলোয়াড়দের কড়া শাসনে রাখা এই ম্যাচ পরিচালকের রয়েছে এক দুর্দান্ত অ্যাকাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড। তিনি কেবল একজন ফিফা এলিট রেফারিই নন, মাঠের বাইরে তিনি একজন পুরোদস্তুর শিক্ষক। এল সালভাদর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কেমিক্যাল সায়েন্সে উচ্চশিক্ষা শেষ করে যিনি ওই একই প্রতিষ্ঠানের জৈব রসায়ন বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন। ল্যাবরেটরির রসায়নের সেই অধ্যাপক ইভান বার্তন এবার ডালাসের মাঠে ফুটবল বিশ্বের অন্যতম হাই-ভোল্টেজ ম্যাচের সমীকরণ মেলাতে নামছেন।
ফিফা প্রথা অনুযায়ী ম্যাচের ঠিক আগের দিন অফিশিয়ালদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করেছে। আর সেই তালিকায় প্রধান রেফারি হিসেবে রাখা হয়েছে ৩৫ বছর বয়সী ইভান বার্তনকে। এই বড় ম্যাচের দায়িত্ব পাওয়ার সাথে সাথে ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম লিখিয়েছেন তিনি। ছেলেদের ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে সেমিফাইনাল ম্যাচ পরিচালনার গৌরব অর্জন করা প্রথম এল সালভাদরিয়ান রেফারি এখন এই রসায়নের শিক্ষক। গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচে বার্তনের সহকারী হিসেবে মাঠের দুই প্রান্তে থাকবেন তাঁরই স্বদেশি দাভিদ মোরান ও আন্তোনিও পুপিরো। এ ছাড়া চতুর্থ অফিশিয়াল হিসেবে সুইডেনের গ্লেন নিবার্গ এবং রিজার্ভ সহকারী রেফারি হিসেবে থাকবেন আরেক সুইডিশ মাহবোদ বেইগি।
বার্তনের পুরো নাম ইভান আর্কিডেস বার্তন সিসনেরোস। ১৯৯১ সালের ২৭ জানুয়ারি মধ্য আমেরিকার দেশ এল সালভাদরের সান্তা আনায় তাঁর জন্ম। পড়াশোনায় দারুণ মেধাবী এই মানুষটি ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি তীব্র টান অনুভব করতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নের জটিল সূত্র পড়ানোর পাশাপাশি তিনি এল সালভাদরের ঘরোয়া ফুটবলে নিয়মিত ম্যাচ পরিচালনা করতে শুরু করেন। ঘরোয়া লিগে তাঁর সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়লে ২০১৮ সালে তিনি ফিফার আন্তর্জাতিক রেফারির তালিকায় জায়গা করে নেন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পা রাখার পর থেকে ইভান বার্তনকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। কনকাকাফ গোল্ড কাপ, কনকাকাফ নেশন্স লিগ, অলিম্পিক ফুটবল ও কোপা আমেরিকার মতো বড় টুর্নামেন্টে ম্যাচ পরিচালনা করে তিনি নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। গত কাতার বিশ্বকাপেও তিনি সফলভাবে তিনটি ম্যাচ পরিচালনা করেছিলেন, যার মধ্যে ইংল্যান্ড ও সেনেগালের মধ্যকার শেষ ষোলোর ম্যাচটি ছিল অন্যতম। মাঠের নিখুঁত সিদ্ধান্ত ও নিরপেক্ষ মনোভাবের কারণে খুব দ্রুতই তিনি ফিফার নীতিনির্ধারকদের বিশ্বস্ত পাত্রে পরিণত হন।
সেই আস্থারই পুরস্কার হিসেবে চলতি বৈশ্বিক আসরে সেমিফাইনালসহ মোট চারটি ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্ব পেলেন বার্তন। তবে এবারের আসরের গ্রুপ পর্বে প্যারাগুয়ে বনাম তুরস্কের ম্যাচে তাঁর একটি সাহসী সিদ্ধান্ত ফুটবল মহলে ব্যাপক শোরগোল ফেলে দেয়। প্রথমার্ধের ইনজুরি টাইমে প্যারাগুয়ের মিডফিল্ডার মিগুয়েল আলমিরন প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডার মের্ত মুলদুরের মুখে মুখ ঠেকে আপত্তিকর কিছু একটা বলেন। বিষয়টি বার্তনের নজরে আসতেই তিনি ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির (ভিএআর) শরণাপন্ন হন। ভিডিও ফুটেজ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করে ফুটবলীয় শিষ্টাচার লঙ্ঘনের দায়ে আলমিরনকে সরাসরি লাল কার্ড দেখান তিনি। মুখ ঢেকে কথা বলার অপরাধে চলতি বিশ্বকাপে এটিই প্রথম লাল কার্ডের ঘটনা।
মাঠে এমন একজন আপসহীন ও কড়া মেজাজের শিক্ষকের অধীনে খেলতে নামার আগে কিলিয়ান এমবাপ্পে কিংবা লামিন ইয়ামালদের মতো বিশ্বসেরা তারকাদের যে বাড়তি সতর্ক থাকতে হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ক্লাসরুমের ল্যাবরেটরির মতোই মাঠের শৃঙ্খলা রক্ষায় ইভান বার্তন কোনো রকম ভুলের সুযোগ দেবেন না, এটাই এখন ফুটবলপ্রেমীদের প্রত্যাশা।