বিশ্বকাপের ইতিহাস সাধারণত লেখা হয় দলকে কেন্দ্র করে। কোনো দেশের উত্থান, কোনো দলের স্বপ্নভঙ্গ কিংবা কোনো জাতির ফুটবল মহাকাব্যই হয়ে ওঠে আলোচনার মূল বিষয়। তবে কিছু বিশ্বকাপ আছে, যেখানে দলকে ছাপিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসেন কয়েকজন অসাধারণ ফুটবলার। ২০২৬ বিশ্বকাপ যেন ঠিক তেমনই এক অনন্য গল্পের জন্ম দিচ্ছে। এবারের আসরে গোল্ডেন বুট বা সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার জয়ের লড়াইটি রূপ নিয়েছে এক জমজমাট ও রুদ্ধশ্বাস প্রতিযোগিতায়।
এই গল্পের প্রধান চরিত্র চারজন—লিওনেল মেসি, কিলিয়ান এমবাপ্পে, আর্লিং হালান্ড এবং চিরসবুজ ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। প্রত্যেকের ফুটবল দর্শন আলাদা, খেলার ধরন ভিন্ন, কিন্তু লক্ষ্য একটাই—প্রতিপক্ষের জাল কাঁপানো।
Table of Contents
রেকর্ডের চূড়ায় লিওনেল মেসি
ডালাসে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার জয়ে এককভাবে নায়ক ছিলেন লিওনেল মেসি। ম্যাচে চোখধাঁধানো জোড়া গোল করে তিনি শুধু দলকে এগিয়ে দেননি, বিশ্বকাপ ইতিহাসেও নিজের নাম নিয়ে গেছেন এক অবাস্তব উচ্চতায়। জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসার ১৬ গোলের রেকর্ড অনেক আগেই পেরিয়ে যাওয়া মেসি বিশ্বমঞ্চে নিজের মোট গোলসংখ্যা নিয়ে গেছেন ১৮-তে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হলো, চলতি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা এখন পর্যন্ত যে পাঁচটি গোল করেছে, তার সবকটিই এসেছে মেসির পা থেকে। ৩৮ বছর বয়সেও তিনি যেন সময়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব নতুন করে প্রমাণ করছেন। বয়স তার ধার কমায়নি, বরং গোলের ক্ষুধা আরও বাড়িয়ে তুলেছে। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে তার দ্বিতীয় গোলের আগে যে পরিশ্রম আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি দেখা গেছে, তাতে স্পষ্ট—তিনি এখনও নতুন ইতিহাস লিখতে পুরোপুরি প্রস্তুত।
মেসির রেকর্ড ভাঙার দায়িত্বে এমবাপ্পে
মেসির ঠিক পেছনেই নিঃশব্দে ও দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। ইরাকের বিপক্ষে নিজের শততম আন্তর্জাতিক ম্যাচে জোড়া গোল করেছেন ফ্রান্সের এই অধিনায়ক। তিনটি বিশ্বকাপ মিলিয়ে মাত্র ২৭ বছর বয়সেই তার মোট গোলসংখ্যা এখন ১৬।
এর আগে ২০১৮ বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে শিরোপা জিতিয়েছেন, ২০২২ সালে লুসাইল স্টেডিয়ামে খেলেছেন মহাকাব্যিক এক ফাইনাল। সামনে আরও অন্তত দুটি বিশ্বকাপ খেলার সম্ভাবনা থাকায় মেসির ১৮ গোলের রেকর্ড ভাঙার সবচেয়ে বড় দাবিদার ভাবা হচ্ছে তাকেই। ফরাসি ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, এবারের বিশ্বকাপটি এমবাপ্পের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশের মঞ্চ হয়ে উঠতে পারে।
গোলমেশিন হালান্ডের হুঙ্কার
এই দৌড়ে আরেকটি নাম ক্রমেই বড় হয়ে উঠছে, তিনি নরওয়ের গোলমেশিন আর্লিং হালান্ড। বিশ্বকাপ শুরুর আগে গোল্ডেন বুটের আলোচনায় এই স্ট্রাইকারকে নিয়ে খুব বেশি মাতামাতি না হলেও, নিজের অভিষেক বিশ্বকাপেই তিনি জাত চিনিয়েছেন।
টানা দুই ম্যাচে দুটি করে গোল করে হালান্ডের বর্তমান সংগ্রহ চার গোল। আন্তর্জাতিক ফুটবলে নরওয়ের জার্সিতে ৫২ ম্যাচে তার গোল সংখ্যা এখন ৫৯টি। আর বিশ্বকাপের প্রথম দুই ম্যাচেই তিনি যা করে দেখিয়েছেন, তা দেশটির ফুটবল ইতিহাসে একদম নজিরবিহীন। সাবেক ফুটবলারদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, স্বাভাবিক প্রতিভার বিচারে মেসি কিংবা এমবাপ্পে এগিয়ে থাকলেও, কেবল নিখুঁত ফিনিশিং ও গোল করার দক্ষতার কথা বললে হালান্ডের সমকক্ষ বর্তমান বিশ্বে খুঁজে পাওয়া কঠিন।
রোনালদোর প্রত্যাবর্তন ও অন্যান্যরা
খারাপ সময়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আবারও পাদপ্রদীপের আলোয় ফিরে এসেছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচে দুর্দান্ত ফিনিশিংয়ে জোড়া গোল করে তিনিও নিজের উপস্থিতির জানান দিয়েছেন। ৪১ বছর বয়সে এসেও যেভাবে তিনি রেকর্ড ভাঙা-গড়ার খেলায় মেতে আছেন, তাতে সামনের ম্যাচগুলোতে রোনালদো জ্বলে উঠলে গোল্ডেন বুটের রেসটি যে আরও কঠিন হবে, তা বলাই বাহুল্য। এছাড়া জার্মানির ডেনিজ আন্দাভও তিন গোল করে অলক্ষ্যে এই দৌড়ে শামিল হয়েছেন।
চলতি বিশ্বকাপে দুই ম্যাচ শেষে মেসি দাঁড়িয়ে আছেন ৫ গোলে, আর এমবাপ্পে ও হালান্ড সমান ৪টি করে গোল করেছেন। বিশ্বকাপ ইতিহাসে মাত্র দ্বিতীয়বার এমন দৃশ্য দেখা গেল, যখন প্রথম দুই ম্যাচের পর অন্তত তিনজন ফুটবলারের গোলসংখ্যা চার বা তার বেশি। এর আগে ১৯৫৪ বিশ্বকাপে এমনটা ঘটেছিল, যেখানে হাঙ্গেরির সান্দর কচিস ১১ গোল করেছিলেন। চার বছর পর ১৯৫৮ বিশ্বকাপে ফ্রান্সের জাস্ট ফন্টেইন গড়েছিলেন এক আসরে ১৩ গোলের অবিশ্বাস্য রেকর্ড, যা আজও অক্ষত।
আমেরিকান ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুন একবার মজা করে বলেছিলেন, মেসি, এমবাপ্পে আর হালান্ডকে দেখে বিরক্ত লাগে; কারণ তারা মাঠে নামলেই গোল করবেন। এবারের ২০২৬ বিশ্বকাপও যেন সেই কথারই প্রতিধ্বনি। শেষ পর্যন্ত গোল্ডেন বুট কার হাতে উঠবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে মহাতারকাদের এই রুদ্ধশ্বাস লড়াই ফুটবলপ্রেমীদের মনে অনেক দিন দাগ কেটে থাকবে।
