২৫ বছর বয়সেই নিভে গেল দক্ষিণ আফ্রিকার ফুটবলার জেদেনের জীবন

বিশ্বকাপ ফুটবলের মঞ্চে দেশের হয়ে ইতিহাস গড়ে ঘরে ফেরার মাসখানেকের মাথাতেই বিদায় নিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার জাতীয় ফুটবল দলের তরুণ ও প্রতিভাবান মিডফিল্ডার জেডেন অ্যাডামস। মাত্র ২৫ বছর বয়সে তাঁর এই আকস্মিক ও অকাল মৃত্যুতে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে বিশ্ব ফুটবলাঙ্গনে। সম্প্রতি শেষ হওয়া ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রতিটি ম্যাচেই মাঝমাঠ কাঁপানো এই ফুটবলারের এমন প্রস্থান কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না তাঁর সতীর্থ ও ভক্তরা। সবশেষ গত জুন মাসে মেক্সিকোর বিপক্ষে দেশের জার্সি গায়ে মাঠে নেমেছিলেন এই তরুণ। এরপর দেশের হয়ে আরও কিছু স্মরণীয় ম্যাচ খেলেছেন। কিন্তু কে জানত, মাঠের সেই লড়াকু ফুটবলার জীবনের ম্যাচ থেকে এত দ্রুত বিদায় নেবেন!

বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার রূপকথা ও জেদেনের বীরত্ব

সদ্য সমাপ্ত ২০২৬ বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার ফুটবল দল এক অবিশ্বাস্য রূপকথা উপহার দিয়েছিল ফুটবল বিশ্বকে। আর সেই রূপকথার অন্যতম প্রধান কারিগর ছিলেন জেডেন অ্যাডামস। গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলোতে দলের মাঝমাঠের মূল ভরসা ছিলেন এই মিডফিল্ডার। তাঁর দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে ভর করেই দক্ষিণ আফ্রিকা প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জায়গা করে নিয়ে নতুন ইতিহাস লেখে। যদিও শেষ পর্যন্ত ‘রাউন্ড অব ৩২’-এর লড়াইয়ে স্বাগতিক কানাডার কাছে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিতে হয় আফ্রিকান দলটিকে, তবে জেডেনসহ পুরো দল যে বীরত্ব দেখিয়েছিল, তা ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে দীর্ঘকাল দাগ কেটে থাকবে।

মাঠের বাইরেও জেডেন ছিলেন একজন অদম্য মানসিকতার মানুষ। বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে যখন চেক প্রজাতন্ত্রের (চেকিয়া) বিপক্ষে ম্যাচ খেলার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তার কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি তাঁর ৭২ বছর বয়সী দাদি মারিয়ানা অ্যাডামসের মৃত্যুসংবাদ পান। এমন কঠিন মানসিক আঘাত এবং স্বজন হারানোর বেদনা বুকে চেপেও তিনি সেদিন দেশের জন্য মাঠে নেমেছিলেন। পেশাদারিত্ব এবং দেশের প্রতি ভালোবাসার এমন নজির ফুটবল ইতিহাসে সত্যিই বিরল।

রহস্যজনক মৃত্যু ও শোকস্তব্ধ ফুটবল বিশ্ব

কেপটাউনের শটসচে ক্লুফের একটি বাড়ি থেকে এই ফুটবলারের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তবে তাঁর মৃত্যুর সঠিক কারণ এখনো জানা যায়নি এবং পুলিশ বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে। জেডেন অ্যাডামসের মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত হওয়ার পরপরই দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রীড়া, শিল্প ও সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী গেইটন ম্যাকেঞ্জি গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। এক আবেগঘন বিবৃতিতে তিনি বলেন, অত্যন্ত দুঃখ ও বিস্ময়ের সঙ্গে জেডেন অ্যাডামসের মৃত্যুর খবরটি পেয়েছি। দক্ষিণ আফ্রিকার ফুটবল তার অন্যতম উজ্জ্বল ও সম্ভাবনাময় তরুণ প্রতিভাকে হারাল। মন্ত্রী আরও বলেন, জেডেন একজন সাধারণ একাডেমি খেলোয়াড় থেকে যেভাবে নিজের যোগ্যতায় জাতীয় দলের নির্ভরযোগ্য স্তম্ভ হয়ে উঠেছিলেন, তা নতুন প্রজন্মের ফুটবলারদের জন্য বড় এক অনুপ্রেরণা। ক্রীড়ামন্ত্রী সাধারণ মানুষ ও গণমাধ্যমকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, যথাযথ কর্তৃপক্ষ তদন্ত শেষে যথাসময়ে বিস্তারিত তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে জানাবে।

এদিকে দক্ষিণ আফ্রিকান ফুটবল প্লেয়ার্স ইউনিয়নও এই মিডফিল্ডারের মৃত্যুতে গভীর শোক ও শ্রদ্ধা জানিয়েছে। সংস্থাটি তাদের বিবৃতিতে বলেছে, বিশ্বকাপে দেশের স্বপ্ন বুকে নিয়ে জেডেন যেভাবে সাহসিকতা, নিষ্ঠা ও গর্বের সাথে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন, তা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। এই ক্ষতি কোনোভাবেই পূরণ হওয়ার নয়। আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার সভাপতি জান্নি ইনফান্তিনোও এই তরুণ ফুটবলারের আকস্মিক প্রস্থানে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং তাঁর পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন।

ক্লাব ক্যারিয়ার ও সাফল্যের খতিয়ান

আন্তর্জাতিক ফুটবলের পাশাপাশি ক্লাব ক্যারিয়ারেও জেডেন অ্যাডামস ছিলেন দারুণ সফল। ঘরোয়া লিগে স্টেলেনবস এফসি দিয়ে তাঁর মূল ফুটবল যাত্রা শুরু হয়েছিল, যেখানে তিনি ক্লাবটির ইতিহাসে প্রথম একাডেমি গ্র্যাজুয়েট হিসেবে পেশাদার চুক্তি স্বাক্ষর করেন। ক্লাবটির হয়ে ১৩৯টি ম্যাচ খেলে ২০২৩ সালের কার্লিং নকআউট ট্রফি জেতেন তিনি। সেখানে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখার পর, ২০২৫ সালের জানুয়ারি উইন্ডোতে তিনি যোগ দেন আফ্রিকার অন্যতম পরাশক্তি ক্লাব মামেলোদি সানডাউনসে।

নতুন ক্লাবে গিয়েই তিনি অভূতপূর্ব সাফল্যের দেখা পান। দলটির হয়ে লিগ শিরোপার মেডেল গলায় তোলার পাশাপাশি মরক্কোর ক্লাব এএস এফএআর-কে হারিয়ে মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্বের আসর আফ্রিকান চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ট্রফিও উঁচিয়ে ধরেন তিনি। এছাড়া ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত আফ্রিকা কাপ অব নেশনসে (আফকন) দক্ষিণ আফ্রিকা দল যে ব্রোঞ্জ পদক জিতেছিল, সেই স্কোয়াডেরও একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন জেডেন। সব মিলিয়ে ক্যারিয়ারের সুবর্ণ সময়েই নিভে গেল আফ্রিকার ফুটবলের এই উজ্জ্বল নক্ষত্র।

মন্তব্য করুন