
৪২ কোটি টাকায় বিক্রি হলো ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ বল
বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত ঘটনার অন্যতম স্মারকটি অবশেষে নতুন এক সংগ্রাহকের হাতবদল হয়েছে। ১৯৮৬ সালে মেক্সিকোর ঐতিহাসিক অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে তৈরি হয়েছিল এই ইতিহাস। সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনার ফুটবল জাদুকর ডিয়েগো আর্মান্দো ম্যারাডোনার বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং এর পরপরই করা শতাব্দীর সেরা গোলটিতে ব্যবহৃত আসল বলটি নিলামে বিক্রি হয়েছে ২.৫ মিলিয়ন পাউন্ডে। বাংলাদেশি মুদ্রায় হিসাব করলে এর বাজারমূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৪১ কোটি ৮৩ লাখ টাকা।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসভিত্তিক নিলামকারী প্রতিষ্ঠান ‘হেরিটেজ অকশন’-এর মাধ্যমে বলটি হস্তান্তরিত হয়। সাদা-কালো শেডের বহু পুরোনো এই অ্যাডিডাস অ্যাজটেকা বলটি এখন অনেকটাই রঙচটে গেছে, ওপরের চামড়া এবড়ো-থেবড়ো এবং এটি এখন পুরোপুরি খেলার অনুপযুক্ত। কিন্তু ম্যারাডোনার ইতিহাস জড়িয়ে থাকায় এর বস্তুগত চেহারার চেয়ে ঐতিহাসিক মূল্য বহু গুণ বেশি। নিলামের আগেই ক্রীড়া বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেছিলেন যে, এটি ইতিহাসের অন্যতম মহারঘ স্মারক হতে চলেছে। নিলামকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরাও স্পষ্ট করে জানান, ক্রীড়াজগতে টিকে থাকা ঐতিহাসিক অনুষঙ্গগুলোর তালিকায় এই ফুটবলটির স্থান একেবারে শীর্ষে।
১৯৮৬ সালের ২২ জুন বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে মেক্সিকো সিটিতে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা। আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও ফুটবলের বৈরিতা মিলিয়ে ম্যাচটি নিয়ে টানটান উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। ম্যাচের ৫১ মিনিটে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা ঘটে। ইংলিশ গোলরক্ষক পিটার শিল্টনের সঙ্গে শূন্যে লাফিয়ে উঠে ম্যারাডোনা বাঁ হাত দিয়ে বলটি জালে ঠেলে দেন। তিউনিসিয়ার রেফারি আলী বিন নাসের বিষয়টি খেয়াল না করায় গোলটি মেনে নেন। খেলা শেষে গোলটি নিয়ে বিশ্বজুড়ে চরম বিতর্ক শুরু হলে ম্যারাডোনা তাঁর সেই চিরস্মরণীয় মন্তব্যটি করেন, “গোলটি হয়েছে কিছুটা ম্যারাডোনার মাথা দিয়ে আর কিছুটা ঈশ্বরের হাত দিয়ে।” সেই থেকেই এটি ‘হ্যান্ড অব গড’ নামে পরিচিত পায়।
তবে বিতর্ক দিয়ে শুরু হলেও চার মিনিট পরেই ফুটবলবিশ্ব দেখে এক মহাকাব্যিক দৃশ্য। নিজস্ব অর্ধ থেকে একক প্রচেষ্টায় বল ড্রিবল করে দৌড় শুরু করেন ম্যারাডোনা। গতি ও চতুরতায় একে একে পরাস্ত করেন ইংল্যান্ডের পাঁচ ডিফেন্ডার—পিটার বিয়ার্ডসলি, স্টিভ হজ, পিটার রিড, টেরি বুচার ও টেরি ফোনউইককে। সবশেষে গোলরক্ষক শিল্টনকে চাতুর্যের সঙ্গে কাটিয়ে বল পাঠান জালে। ২-১ গোলের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে আর্জেন্টিনা। পরবর্তীতে ফিফার অনলাইন ভোটে ম্যারাডোনার এই একক প্রয়াসের গোলটি আনুষ্ঠানিকভাবে ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ বা শতাব্দীর সেরা গোলের মর্যাদা পায়।
ঐতিহাসিক এই বলটি ৩৬ বছরেরও বেশি সময় ধরে নিজের কাছে যত্নে রেখেছিলেন সেই ম্যাচের বিতর্কিত রেফারি আলী বিন নাসের। মেক্সিকো বিশ্বকাপের পর থেকেই এটি তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহে ছিল। পরবর্তী সময়ে এক লিখিত সনদে তিনি নিশ্চিত করেছিলেন, সেই রোমাঞ্চকর ৯০ মিনিটের পুরোটা জুড়েই কেবল এই একটি বলই ব্যবহার করা হয়েছিল।
২০২২ সালের নভেম্বরে আলী বিন নাসের বলটি লন্ডনের এক নিলামে ১.৭৪ মিলিয়ন পাউন্ডে বিক্রি করে দেন। সেই বলের নতুন মালিক ২০২৩ সালে আবারও নিলামে তোলার উদ্যোগ নিলেও আশানুরূপ সর্বনিম্ন দর না ওঠায় সেবার বিক্রি স্থগিত হয়ে যায়। অবশেষে হেরিটেজ অকশনে ২.৫ মিলিয়ন পাউন্ডে হাতবদল হলেও প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, তাদের প্রত্যাশা ছিল বলটির দাম অন্তত ৫ মিলিয়ন পাউন্ড বা তারচেয়েও বেশি উঠবে।
ক্রীড়া স্মারক হিসেবে এর বিশালতার তুলনা মিলবে ম্যারাডোনার সেই ম্যাচের জার্সিটির দিকে তাকালে। ২০২২ সালের মে মাসে লন্ডনে সোদেবিসের নিলামে ম্যারাডোনার পরা ঐতিহাসিক নীল জার্সিটি বিকিয়েছিল রেকর্ড ৯.৩ মিলিয়ন ডলারে (প্রায় ৭.১ মিলিয়ন পাউন্ড)। অর্থমূল্যের বিচারে জার্সির চেয়ে কিছুটা কম হলেও, অ্যাডিডাসের তৈরি এই ‘অ্যাজটেকা’ ফুটবলটি বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের আবেগের জায়গায় চিরকাল অনন্য হয়ে থাকবে।