রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেও মানসিক চাপ ও পারিবারিক উৎকণ্ঠাকে জয় করে ফ্রেঞ্চ ওপেনের দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠেছেন ইউক্রেনের টেনিস তারকা Marta Kostyuk। ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে তার পরিবারের বাসার অদূরে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটার পরও রোববার প্যারিসের ক্লে কোর্টে নেমে জয় তুলে নেন তিনি।
ফ্রেঞ্চ ওপেনের প্রথম রাউন্ডে রাশিয়ার বংশোদ্ভূত খেলোয়াড় Oksana Selekhmeteva-কে সরাসরি সেটে হারিয়ে দ্বিতীয় রাউন্ড নিশ্চিত করেন কোস্তিউক। ম্যাচে শুরু থেকেই নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখেন ইউক্রেনীয় এই খেলোয়াড়। প্রথম সেট ৬-২ ব্যবধানে জয়ের পর দ্বিতীয় সেটেও ৬-৩ গেমে জয় নিশ্চিত করেন তিনি।
ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে নিজের মানসিক অবস্থার কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন কোস্তিউক। তিনি জানান, ম্যাচ শুরুর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে কিয়েভ থেকে ধ্বংসস্তূপের ছবি ও ভিডিও তার কাছে পৌঁছায়। ওই এলাকায় তার মা, বোন ও খালা অবস্থান করছিলেন। ক্ষেপণাস্ত্র হামলাটি তাদের বাসার খুব কাছাকাছি হয় বলে জানান তিনি।
কোস্তিউক বলেন, “আমি ভাবছিলাম, ক্ষেপণাস্ত্রটি যদি আরও ১০০ মিটার কাছে গিয়ে পড়ত, তাহলে হয়তো আজ আমার মা ও বোন বেঁচে থাকতেন না। এই চিন্তা আমাকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “টেনিস এমনিতেই মানসিকভাবে কঠিন একটি খেলা। কিন্তু আজকের পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমি নিশ্চিত ছিলাম না যে আমি মনোযোগ ধরে রাখতে পারব কি না কিংবা নিজের চিন্তাগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারব কি না।”
তবে ব্যক্তিগত উদ্বেগ ও পারিবারিক দুশ্চিন্তার প্রভাব কোর্টে পড়তে দেননি কোস্তিউক। পুরো ম্যাচে আত্মবিশ্বাসী টেনিস খেলেন তিনি। তার সার্ভিস গেম, বেসলাইন নিয়ন্ত্রণ এবং আক্রমণাত্মক শট প্রতিপক্ষকে চাপে রাখে। ম্যাচ চলাকালে একটি আন্ডারআর্ম সার্ভ করে দর্শকদেরও চমকে দেন তিনি।
এই বিশেষ সার্ভ নিয়ে পরে কোস্তিউক বলেন, “যখন ম্যাচে কিছুটা জায়গা পাই, তখন এটা করতে ভালো লাগে। প্রতিপক্ষরা সাধারণত এতে অবাক হয়ে যায়।”
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে ইউক্রেনীয় খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণ বারবার আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে টেনিসে ইউক্রেনের খেলোয়াড়রা যুদ্ধের প্রভাব, পরিবার নিয়ে উদ্বেগ এবং মানসিক চাপের বিষয়গুলো বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ্যে তুলে ধরেছেন। কোস্তিউকও সেই তালিকার অন্যতম পরিচিত নাম।
যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ইউক্রেনের অনেক খেলোয়াড় দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। একই সঙ্গে পরিবার ও স্বজনদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তাদের পেশাদার ক্রীড়া জীবনেও প্রভাব ফেলছে। কোস্তিউকের বক্তব্যে সেই বাস্তবতার প্রতিফলন স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
টুর্নামেন্ট থেকে নাম প্রত্যাহারের কথা ভেবেছিলেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে কোস্তিউক বলেন, “সবাই বেঁচে আছে এবং নিরাপদ আছে—এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যদি আরও খারাপ কিছু ঘটত, তাহলে হয়তো কোর্টে নামা কঠিন হয়ে যেত। কিন্তু আমি জানতাম, আমাকে খেলতে হবে।”
ফ্রেঞ্চ ওপেন বিশ্বের চারটি গ্র্যান্ড স্ল্যাম টুর্নামেন্টের একটি এবং এটি ক্লে কোর্টে অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ র্যালি, শারীরিক সক্ষমতা ও মানসিক দৃঢ়তার জন্য এই টুর্নামেন্টকে টেনিসের অন্যতম কঠিন প্রতিযোগিতা হিসেবে ধরা হয়। এমন পরিস্থিতির মধ্যেও কোস্তিউকের জয় টেনিস অঙ্গনে বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে।
বর্তমান বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব আন্তর্জাতিক ক্রীড়াক্ষেত্রেও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ইউক্রেনীয় ক্রীড়াবিদদের জন্য আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা এখন কেবল ক্রীড়া লড়াই নয়, বরং ব্যক্তিগত মানসিক সংগ্রামেরও অংশ হয়ে উঠেছে। কোস্তিউকের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা সেই বাস্তবতারই আরেকটি উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে।
