টাইব্রেকার ভাগ্যে কলম্বিয়া বধ: ১৯৫৪ সালের পর বিশ্বকাপের শেষ আটে সুইজারল্যান্ড

বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের চরম উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচে কলম্বিয়াকে টাইব্রেকারে বিদায় করে কোয়ার্টার ফাইনালে পা রাখল সুইজারল্যান্ড। ভ্যাঙ্কুভারের মাঠে নির্ধারিত ৯০ মিনিট এবং অতিরিক্ত ৩০ মিনিটের আক্রমণ-প্রতিআক্রমণের পরও কোনো দলই গোলের দেখা পায়নি। অবশেষে পেনাল্টি শুটআউটের রোমাঞ্চকর ভাগ্যপরীক্ষায় কলম্বিয়াকে ৪-৩ ব্যবধানে হারিয়ে মাঠ ছাড়ে সুইসরা। এই জয়ের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ৭২ বছর পর বিশ্বকাপের শেষ আট নিশ্চিত করল ইউরোপের এই দলটি, যা তারা সর্বশেষ অর্জন করেছিল ১৯৫৪ সালে নিজেদের মাটিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে।

বিগত তিনটি বিশ্বকাপে (২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২২) টানা শেষ ১৬-র বাধা টপকাতে না পারার যে আক্ষেপ সুইজারল্যান্ডের ছিল, আজ তারা সেই বৃত্ত ভাঙতে সক্ষম হলো। ঐতিহাসিক এই জয়ের পর কোয়ার্টার ফাইনালে সুইসদের প্রতিপক্ষ লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা, যারা অন্য এক রোমাঞ্চকর ম্যাচে মিশরকে ৩-২ গোলে হারিয়ে শেষ আট নিশ্চিত করেছে।

ভ্যাঙ্কুভারের স্টেডিয়ামটি আজ হাজার হাজার আবেগপ্রবণ কলম্বিয়ান সমর্থকের উপস্থিতিতে যেন লাতিন আমেরিকার কোনো মাঠে পরিণত হয়েছিল। এই ম্যাচের আগে কলম্বিয়ার রক্ষণভাগ ছিল দুর্দান্ত ফর্মে—গত চার ম্যাচে তারা মাত্র একটি গোল হজম করেছিল। অন্যদিকে সুইসদের রক্ষণভাগও ছিল টুর্নামেন্টজুড়ে অপ্রতিরোধ্য। ফলে মাঠের লড়াইয়ে দুই দলের ডিফেন্সের শক্তিমত্তা স্পষ্ট ফুটে ওঠে।

ম্যাচের ২১তম মিনিটে কলম্বিয়া প্রথম বিপজ্জনক আক্রমণটি করে। পেনাল্টি বক্সের প্রান্ত থেকে গুস্তাভো পুয়ের্তার নেওয়া একটি বাঁকানো শট উড়ন্ত দক্ষতায় সেভ করেন সুইস গোলরক্ষক গ্রেগর কোবেল। প্রথম হাইড্রেশন ব্রেকের পরপরই খেলার গতি বাড়ায় সুইজারল্যান্ড। তবে কলম্বিয়ার গোলরক্ষক কামিলো ভার্গাস প্রাচীর হয়ে দাঁড়ান। তিনি প্রথমে ফ্যাবিয়ান রিডারের একটি জোরালো শট এবং পরে ড্যান এনডোয়েকে নিশ্চিত গোলবঞ্চিত করলে প্রথমার্ধ গোলশূন্যভাবেই শেষ হয়।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে সুইজারল্যান্ড আরও আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলার চেষ্টা করে। তবে কলম্বিয়াও পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে সুযোগ তৈরি করছিল। লাতিন দলটির লুইস সুয়ারেজ একটি দারুণ সুযোগ পেলেও তার শটটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। ম্যাচ যতই টাইব্রেকারের দিকে এগোচ্ছিল, দুই দলের কোচের কৌশলগত খেলোয়াড় পরিবর্তন ততই বাড়ছিল। তবে মাঠের রক্ষণভাগের দৃঢ়তায় পরিষ্কার কোনো সুযোগ তৈরি করা সম্ভব হচ্ছিল না। বিশেষ করে কলম্বিয়ার প্রধান তারকা উইঙ্গার লুইস দিয়াজকে পুরোটা সময় বোতলবন্দি করে রাখে সুইস ডিফেন্ডাররা। অতিরিক্ত সময়ের ঠিক আগে এনডোয়ের একটি শট পোস্টের সামান্য বাইরে দিয়ে চলে গেলে ম্যাচটি ০-০ সমতায় অতিরিক্ত সময়ে গড়ায়।

অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধে মাঠের স্নায়ুচাপ আরও বেড়ে যায়। নবম মিনিটে কর্নার থেকে কলম্বিয়ার ডিফেন্ডার জন লুকুমির একটি চমৎকার হেড গোলপোস্টে লেগে ফিরে আসলে দুর্ভাগ্যবশত গোলবঞ্চিত হয় কলম্বিয়া। এরপর জামিন্টন ক্যাম্পাজের একটি জোরালো শট কোবেল চমৎকারভাবে আটকে দেন। পরক্ষণেই কলম্বিয়ার গোলরক্ষক ভার্গাস বাঁ দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে সুইস বদলি খেলোয়াড় জেকি আমদুনির একটি দুর্দান্ত প্রচেষ্টা নস্যাৎ করে দেন। খেলার শেষ পাঁচ মিনিটে ক্যাম্পাজ ম্যাচ জেতানোর এক সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করলে পেনাল্টি শুটআউট অনিবার্য হয়ে পড়ে।

টাইব্রেকারের চরম নাটকীয়তায় দুই দলই পেনাল্টি মিসের মহড়ায় নামে। সুইজারল্যান্ডের ম্যানুয়েল আকাঞ্জি গোলবারের ওপর দিয়ে শট মারলে সুইস শিবিরে শঙ্কা জাগে। তবে কলম্বিয়ার ডেভিনসন সানচেজও গোল করতে ব্যর্থ হন। এরপর কলম্বিয়ার কুচো হার্নান্দেজের নেওয়া শেষ শটটি সুইজারল্যান্ডের গোলরক্ষক গ্রেগর কোবেল দুর্দান্তভাবে ঠেকিয়ে দিয়ে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেন। শেষ শটে রুবেন ভার্গাস ঠাণ্ডা মাথায় লক্ষ্যভেদ করতেই ৭২ বছর পর ইতিহাস গড়ার আনন্দে মেতে ওঠে সুইজারল্যান্ড, আর অশ্রুসিক্ত চোখে মাঠ ছাড়ে কলম্বিয়া।

মন্তব্য করুন