
বড় মঞ্চের অভিজ্ঞতা ও মেসি-ম্যাজিকে ফাইনালের পথে ফেভারিট আর্জেন্টিনা
বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় মঞ্চে টিকে থাকার লড়াইয়ে স্নায়ুচাপ সামলানোই আসল পরীক্ষা। নকআউটের রোমাঞ্চকর সব ধাপ পেরিয়ে লিওনেল স্কালোনির দল যখন সেমিফাইনালের মহারণে নামছে, তখন তাদের সামনে টানা দ্বিতীয়বার ফাইনালে ওঠার দারুণ হাতছানি। মাঠের লড়াইয়ে প্রতিপক্ষ হিসেবে ইংল্যান্ড নিঃসন্দেহে এই আসরের অন্যতম কঠিন প্রতিপক্ষ। তবে মাঠের পরিসংখ্যান এবং দলের শক্তিমত্তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ফাইনালে ওঠার দৌড়ে আলবিসেলেস্তেরা বেশ কয়েকটি দিক থেকে এগিয়ে রয়েছে। মূলত চারটি বড় শক্তির ওপর ভর করে এবারও ফাইনালে চোখ রাখছে লিওনেল মেসির দল।
Table of Contents
১. বড় ম্যাচের চাপ সামলানোর অভিজ্ঞতা
বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের মতো হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে ট্যাকটিকসের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়ায় মানসিক শক্তি। এই জায়গায় ইংল্যান্ডের চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে আর্জেন্টিনা। বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে তারা জানে কীভাবে খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে হয়। অন্যদিকে ১৯৬৬ সালের পর ইংল্যান্ড আর কখনো বিশ্বকাপের ফাইনালে পা রাখতে পারেনি।
ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত বিশ্বমঞ্চে নকআউটের লড়াইয়ে ২২টি ম্যাচে জয় পেয়েছে আর্জেন্টিনা। বিপরীতে ইংলিশদের নকআউট জয়ের সংখ্যা মাত্র ১৪টি। আরেকটি দুর্দান্ত পরিসংখ্যান স্কালোনির দলকে মানসিকভাবে চাঙ্গা রাখবে—বিশ্বকাপের ইতিহাসে আর্জেন্টিনা এ পর্যন্ত পাঁচবার সেমিফাইনালে উঠেছে এবং প্রতিবারই তারা ফাইনালে খেলার টিকিট কেটেছে। সেমিফাইনালে হারের কোনো রেকর্ড নেই লাতিন আমেরিকার এই পরাশক্তিদের।
২. অপ্রতিরোধ্য লিওনেল মেসি
বয়সটা ৩৯ ছুঁইছুঁই হলেও লিওনেল মেসি এখনও মাঠের শ্রেষ্ঠতম জাদুকর। গোল্ডেন বুটের দৌড়ে ৮ গোল নিয়ে যৌথভাবে শীর্ষে থাকা এই তারকা যেকোনো মুহূর্তে একার কৃতিত্বে ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারেন। প্রতিপক্ষ কোচ টমাস টুখেলের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার কারণও এই খুদে জাদুকর।
ইংল্যান্ড ডাগআউটে বসা টুখেল ম্যাচ-পূর্ব সংবাদ সম্মেলনে প্রতিপক্ষ অধিনায়ককে নিয়ে নিজের ভীতি আড়াল করেননি। তিনি স্পষ্ট করেই বলেছেন, বল পায়ে এলেই মেসি ডিফেন্সের দুর্বলতা খুঁজে নেন এবং নিজের বাঁ পায়ের জাদু দেখানোর জায়গা তৈরি করে নেন। প্রতিপক্ষ দল হিসেবে আর্জেন্টিনা বা মেসির খেলার ধরন কিছুটা অনুমান করা গেলেও, মেসিকে আটকে রাখা প্রায় অসম্ভব। কারণ একটি পথ বন্ধ করলে তিনি মাঠের ভেতরেই আরেকটি নতুন পথ তৈরি করে নেন।
৩. গোল করার অসাধারণ ধারাবাহিকতা
আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগের ধার এখন বিশ্বসেরা। এবারের আসরে এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১৭টি গোল এসেছে তাদের পা থেকে। আক্রমণাত্মক ফুটবলের পসরা সাজিয়ে প্রতি ম্যাচে গড়ে ৭.৮টি করে শট অন টার্গেট রাখছে তারা, যা এই আসরে যেকোনো দলের চেয়ে বেশি।
শুধু এই বিশ্বকাপেই নয়, গত ২০২২ সালের বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে টানা ১২টি ম্যাচে অন্তত দুটি বা তার বেশি গোল করার অনন্য রেকর্ড গড়েছে স্কালোনির শিষ্যরা। শেষ চার ম্যাচের প্রতিটিতেই তারা প্রতিপক্ষের জালে বল পাঠিয়েছে তিনবার করে। এই আক্রমণাত্মক ফুটবল ও নিয়মিত গোল পাওয়ার অভ্যাস সেমিফাইনালের লড়াইয়ে তাদের অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী করে তুলবে।
৪. সুযোগ নষ্ট না করার কার্যকারিতা
ফুটবলে অনেক দলই সুযোগ তৈরি করে গোল করতে ব্যর্থ হয়, কিন্তু আর্জেন্টিনার শক্তি এখানেই যে তারা খুব কম সুযোগ নষ্ট করে। ফুটবল পরিসংখ্যানভিত্তিক প্রতিষ্ঠান অপ্টার তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত প্রতিটি ম্যাচেই আর্জেন্টিনা তাদের প্রত্যাশিত গোলের (Expected Goals বা xG) চেয়ে বেশি গোল করতে সমর্থ হয়েছে।
মেসি এবং হুলিয়ান আলভারেজের মতো স্ট্রাইকাররা ডি-বক্সের ভেতর সামান্য জায়গা পেলেই বা দূরপাল্লার শট থেকেও গোল আদায় করে নিতে পারেন। কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে কঠিন ডিফেন্স ভেঙে অতিরিক্ত সময়ে আলভারেজের করা গোলটিই প্রমাণ করে, সুযোগ তৈরিতে আর্জেন্টিনা কতটা নিখুঁত এবং কার্যকর। এই ধারালো ফিনিশিংই হতে পারে ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগ ভেঙে ফাইনালে যাওয়ার মূল চাবিকাঠি।