বেলজিয়ামের নতুন ফুটবল জাদুকর চার্লস ডি কেটেলারের উত্থান

ফুটবলবিশ্বে কিছু নায়ক আসেন একেবারেই নিঃশব্দে। তারা মাঠের কোলাহল কিংবা প্রচারের আলো পছন্দ করেন না, তবে খেলা শেষে পুরো স্টেডিয়ামকে বুঁদ করে রাখেন এক অদ্ভুত মুগ্ধতায়। বেলজিয়ামের তরুণ ফরোয়ার্ড চার্লস ডি কেটেলার ঠিক তেমনই একজন ফুটবলার। মাঠের সবুজ ঘাসে বলের সঙ্গে তার যে মিতালি, সেই নীরব ছন্দই আজ তাকে বেলজিয়াম ফুটবলের নতুন আশার প্রতীকে পরিণত করেছে। গোল করা কিংবা সতীর্থদের দিয়ে গোল করানো—সবখানেই তিনি রাখছেন তার সহজাত প্রতিভার স্বাক্ষর।

২০০১ সালের ১০ মার্চ বেলজিয়ামের ঐতিহাসিক শহর ব্রুজে জন্ম নেন ডি কেটেলার। তার শৈশব-কৈশোর কেটেছে ফুটবলকে ঘিরেই। খুব অল্প বয়সেই স্থানীয় পরাশক্তি ক্লাব ব্রুজের একাডেমিতে যোগ দেন তিনি। এই ক্লাবের যুব একাডেমি থেকেই আধুনিক ফুটবলের প্রতিটি সূক্ষ্মতা ও কৌশল নিজের মধ্যে রপ্ত করেন এই প্রতিভাবান ফুটবলার।

ক্লাব ফুটবলের কঠিন পথ ও আতালান্তায় পুনরুত্থান

ক্লাব ব্রুজের মূল দলে সুযোগ পাওয়ার পর নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে খুব বেশি সময় নেননি ডি কেটেলার। ঘরোয়া লিগ শিরোপা, সুপার কাপ এবং ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় তার দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দ্রুতই তাকে ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোর নজরে নিয়ে আসে। ফলস্বরূপ, ২০২২ সালে ইতালিয়ান জায়ান্ট এসি মিলানে পাড়ি জমান তিনি। তবে মিলানের সান সিরো স্টেডিয়ামে প্রথম অধ্যায়টি তার মোটেও প্রত্যাশামতো হয়নি। চড়া মূল্যে দলে এলেও নতুন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল তাকে।

অনেকে যখন তার ক্যারিয়ারের ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছিলেন, ডি কেটেলার তখন ভেঙে পড়েননি। সেই ব্যর্থতাকে নিজের শিক্ষক বানিয়ে তিনি ধারে যোগ দেন আরেক ইতালিয়ান ক্লাব আতালান্তায়। সেখানে গিয়েই যেন নতুন করে নিজের চেনা রূপ খুঁজে পান। সিরি আ-তে নিয়মিত গোল ও অ্যাসিস্টের পাশাপাশি ধারাবাহিক পারফরম্যান্স দিয়ে ফুটবলবিশ্বকে আবারও মনে করিয়ে দেন যে, বড় মঞ্চে দাপট দেখানোর জন্যই তার জন্ম হয়েছে।

জাতীয় দলে নতুন প্রজন্মের কাণ্ডারি

বেলজিয়াম ফুটবলের ‘সোনালী প্রজন্ম’ যখন ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে, ঠিক তখনই জাতীয় দলের জার্সিতে ধীরে ধীরে অপরিহার্য হয়ে উঠছেন ডি কেটেলার। কেভিন ডি ব্রুইন ও রোমেলু লুকাকুদের মতো অভিজ্ঞ তারকাদের পাশে নতুন প্রজন্মের প্রধান মুখ হিসেবে এখন তাকেই বিবেচনা করা হচ্ছে।

চলতি বিশ্বকাপই তার ক্যারিয়ারের এক নতুন অধ্যায় লিখে দিচ্ছে। গ্রুপ পর্বের প্রতিটি ম্যাচেই প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে নিজের সৃজনশীলতার ছাপ রেখেছেন তিনি। ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে একের পর এক সুযোগ তৈরি করা, উজবেকিস্তানের বিপক্ষে দলের আক্রমণের নেতৃত্ব দেওয়া এবং কলম্বিয়ার বিপক্ষে অত্যন্ত ধৈর্যশীল ফুটবল খেলে তিনি দলের নির্ভরযোগ্য ভরসা হয়ে ওঠেন। এরপর রাউন্ড অব ৩২-এর বাধা টপকাতে সেনেগালের বিপক্ষে ৩–২ গোলের শ্বাসরুদ্ধকর জয়ে বড় ভূমিকা রাখেন।

তবে আসল ধামাকাটি দেখান শেষ ষোলোর লড়াইয়ে। স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ৪–১ গোলের বড় ব্যবধানে জয়ের ম্যাচে জোড়া গোল করে একাই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেন এই ফরোয়ার্ড। দলের বাকি দুটি গোলের একটিতেও ছিল তার নিখুঁত অ্যাসিস্ট। ম্যাচে সরাসরি তিন গোলে অবদান রেখে স্বভাবতই ম্যাচসেরার পুরস্কারটি নিজের করে নেন তিনি।

আধুনিক ফুটবলের সম্পূর্ণ প্যাকেজ

ডি কেটেলারের বিশেষত্ব শুধু গোল করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি ম্যাচের গতি ও ছন্দ বদলে দিতে পারেন নিখুঁত একটি পাসে, প্রথম স্পর্শে কিংবা একটি বুদ্ধিদীপ্ত মুভমেন্টে। লম্বা গড়ন, অসাধারণ ‘ফার্স্ট টাচ’, দুই পায়েই সমানভাবে বল নিয়ন্ত্রণ এবং রক্ষণভাগের ফাঁক গলে খোলা জায়গা তৈরি করার দক্ষতা তাকে আধুনিক ফুটবলের এক অনন্য আক্রমণভাগের খেলোয়াড়ে পরিণত করেছে।

বিশ্বকাপে নিজের এই স্বপ্নের পথচলা নিয়ে ডি কেটেলার বলেন:

“বেলজিয়ামের জার্সি গায়ে প্রতিটি ম্যাচই আমার কাছে স্বপ্নের মতো। ব্যক্তিগত গোল বা অ্যাসিস্টের চেয়ে দলের জয়ই আমার কাছে সবসময় বড়। আমরা বিশ্বাস করি, এই দল অনেক দূর যাওয়ার ক্ষমতা রাখে। তবে এখন আমাদের লক্ষ্য কেবল পরের ম্যাচটি জয় করা, কারণ নকআউট পর্বে একটি ছোট ভুলই সব স্বপ্ন শেষ করে দিতে পারে।”

অভিজ্ঞদের সঙ্গে নিজের রসায়ন নিয়ে তিনি আরও যোগ করেন, আমাদের দলে অভিজ্ঞতা ও তরুণদের জেতার ক্ষুধা—দুটোই দারুণভাবে মিশে আছে। রোমেলু লুকাকু ও কেভিন ডি ব্রুইনের মতো কিংবদন্তিদের পাশে খেলতে পারাটা বড় সৌভাগ্যের। তাদের কাছ থেকে প্রতিদিন নতুন কিছু শিখছি, যা আমাকে আরও ভালো ফুটবলার হতে সাহায্য করছে।

কোচ ও সতীর্থদের চোখে ডি কেটেলার

বেলজিয়ামের কোচের মুখেও এখন এই শিষ্যের প্রশংসা। কোচের মতে, চার্লস ম্যাচকে খুব ভালোভাবে পড়তে পারে। সে খুব ভালো করেই বোঝে কখন আক্রমণের গতি বাড়াতে হবে আর কখন খেলা নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। বড় ম্যাচে পার্থক্য গড়ে দেওয়ার জন্য এমন ফুটবলারই কোচের মূল অস্ত্র হয়।

একই সুর শোনা গেল অধিনায়ক কেভিন ডি ব্রুইনের গলাতেও। তিনি বলেন:

“চার্লসের মধ্যে ভবিষ্যতের একজন বিশ্বমানের ফুটবলার হওয়ার সব গুণ রয়েছে। তার সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হলো সে সবসময় শিখতে চায় এবং নিজের উন্নতির চেষ্টা করে। এই মানসিকতাই তাকে ফুটবল দুনিয়ায় অনেক দূর নিয়ে যাবে।”

মাঠের বাইরে ডি কেটেলার একেবারেই প্রচারবিমুখ একজন মানুষ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চাকচিক্য কিংবা মিডিয়ার আলো থেকে দূরে থাকতেই ভালোবাসেন। তারকাখ্যাতির চেয়ে অনুশীলনের মাঠই তার কাছে বেশি পছন্দের জায়গা। বিনয়, নিয়মানুবর্তিতা এবং নিরলস পরিশ্রমই তার চরিত্রের আসল শক্তি। ফুটবল ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বড় তারকারা শুধু প্রতিভা নিয়ে টিকে থাকেন না, তারা প্রতিদিন নিজেদের নতুন করে গড়ে তোলেন। চার্লস ডি কেটেলার এখন সেই পথেই হাঁটছেন। মাঠে তার প্রতিটি পায়ের ছোঁয়া যেন এই বার্তাই দেয়—নীরবতারও নিজস্ব এক শক্তি আছে, যা একদিন ইতিহাস হয়ে ধরা দেয়।

মন্তব্য করুন