মাঠের ধুলো ছেড়ে অনন্তলোকে—চিরনিদ্রায় ‘টেলিগ্রাম যুগের’ রণজিৎ দাস

গতকাল ভোরের আলো ফুটেছিল গভীর বিষাদ মেখে। মাত্র কিছুদিন আগেই ফুটবল ও ভলিবল মাঠের কিংবদন্তি মোস্তফা কামালের বিদায়ের শোক কাটতে না কাটতেই এলো আরেকটি করুণ সংবাদ। সিলেটের নির্জন পাহাড়ি এলাকায়, নিজের প্রিয় ‘কমলাকান্ত ভবন’ শূন্য করে চিরতরে চোখ বন্ধ করেছেন ৯৩ বছর বয়সী কিংবদন্তি গোলকিপার রণজিৎ দাস। তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন আজ সকাল ৬টা ৫৫ মিনিটে সিলেটের একটি হাসপাতালে।

রণজিৎ দাসের চলে যাওয়া শুধু একটি ব্যক্তির মৃত্যু নয়; এটি একটি পুরো যুগের অবসান। ১৯৫০-এর দশকে ঢাকার মাঠ মাতিয়েছেন ফুটবল ও হকি খেলায়, আজ তাঁর অনুপস্থিতি ক্রীড়াঙ্গনে এক বিশাল শূন্যতা সৃষ্টি করেছে। শেষ কয়েক বছর তিনি ছিলেন শান্ত ও নিঃশব্দ। স্মৃতিশক্তি ও ভাষা কিছুটা হারিয়েছেন, ফলে সাধারণ মানুষদের সঙ্গে তেমন যোগাযোগ রাখতে পারতেন না।

সিলেটের করের পাড়ায় তাঁর বাড়িতে সবসময়ই ছিল মানুষের আনাগোনা। তবু শেষ সময়ে তিনি নিঃশব্দে বসে ছিলেন, অতীতের গৌরবময় দিনের স্মৃতিগুলোকে মনে রেখে। মাঠে রণজিৎ দাস ছিলেন অন্যরকম।

রণজিৎ দাসের ক্রীড়াজীবনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ

বছরক্লাব/টিমঘটনা/উপলব্ধি
১৯৫৫ইস্পাহানি ক্লাবফুটবল ক্যারিয়ার শুরু
১৯৫৮আজাদ স্পোর্টিংঅধিনায়কত্বে লিগ শিরোপা জয়
১৯৫৭কলকাতা মোহামেডানঅল ইন্ডিয়া ডুরান্ড কাপ খেলেছেন
১৯৬০-এর দশকপূর্ব পাকিস্তান হকি দলঅধিনায়কত্ব এবং প্রতিভার শীর্ষ বিন্দু
২০০৬প্রথম আলো ক্রীড়া পুরস্কারআজীবন সম্মাননা লাভ
২০০৭জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারদেশের সর্বোচ্চ ক্রীড়া স্বীকৃতি

তিনি ছিলেন মাল্টি-ট্যালেন্টেড ক্রীড়াবিদ। ফুটবল থেকে হকি—সবখানেই ছিল তাঁর পদচারণা। পূর্ব পাকিস্তান ফুটবল দলের গোলপোস্ট রক্ষায় ছিলেন নিষ্ঠাবান, আর হকিতে দলের অধিনায়কত্বও সামলেছেন। ৬০-এর দশকে তিনি হকিতে দাপিয়ে খেলেছেন।

কিন্তু উচ্চতার কারণে পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলে সুযোগ পাননি—এটি তাঁর জীবনের একটি আক্ষেপ। একবার তিনি নিজেই বলেছেন, “উচ্চতা কম ছিল বলেই হয়তো সুযোগ হয়নি।” তবে সেই আক্ষেপ কিছুটা মিটেছিল ২০০৬ সালে প্রথম আলো ক্রীড়া পুরস্কার ও ২০০৭ সালে জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার প্রাপ্তির মাধ্যমে।

শেষ জীবনে স্ত্রী রেখা দাসই ছিলেন তাঁর একমাত্র অবলম্বন। যিনি একসময় মাঠের সব অজানা গল্প অনর্গল বলে যেতেন এবং নিজেকে ‘টেলিগ্রাম যুগের মানুষ’ বলতেন, শেষ সময়ে ছিলেন নিঃশব্দ।

২০২৪ সালে কিংবদন্তি জাকারিয়া পিন্টু চলে গেছেন, তার আগে জহিরুল হক, আর আজ রণজিৎ দাস। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের এই মহীরুহগুলো একে একে হারানো দেশের ক্রীড়াপ্রেমীদের জন্য এক গভীর শূন্যতা।

সিলেটের সেই পাহাড়ি রাস্তার ঢালে এখন আর কেউ ফুটবল-হকির গল্প শোনার জন্য দাঁড়িয়ে থাকবে না। রণজিৎ দাস নেই, কিন্তু তাঁর বীরত্বগাথা ও অবিস্মরণীয় ক্রীড়া জীবন বাংলাদেশের ক্রীড়ার ইতিহাসে চিরকাল সোনালি অক্ষরে লেখা থাকবে।

Leave a Comment