
মেটলাইফে মেসির চোখ সজল, ফিরে এলো এক দশকের আবেগ
নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়াম লিওনেল মেসির আন্তর্জাতিক ফুটবল ক্যারিয়ারের সবচেয়ে নাটকীয় ও আবেগঘন অধ্যায়গুলোর নীরব সাক্ষী। এক দশক আগে এই মাঠের সবুজ ঘাসেই কোপা আমেরিকার শতবর্ষী আসরের ফাইনালে শিরোপা হাতছাড়া করে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন আর্জেন্টাইন জাদুকর। সেই চেনা মেটলাইফেই আবারও অশ্রুসিক্ত হলেন ফুটবলের এই বরপুত্র। তবে এবার আবেগের প্রেক্ষাপট ও পারিপার্শ্বিকতা ভিন্ন হলেও অনুভূতির গভীরতা ছিল ঠিক এক দশক আগের মতোই তীব্র।
মেটলাইফ স্টেডিয়ামের নাম এলেই অবিনশ্বর ফুটবল ইতিহাসের পাতায় ভেসে ওঠে এক বেদনাময় স্মৃতি। ২০১৬ সালের ২৬ জুন কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির বিপক্ষে ম্যাচটি টাইব্রেকারে গড়ায়। সেখানে পেনাল্টি শুট-আউটে স্পট কিক থেকে গোল করতে ব্যর্থ হন মেসি। সেই অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যর্থতায় শিরোপা হাতছাড়া হয় আর্জেন্টিনার। ম্যাচ শেষে তীব্র হতাশায় মাঠের মধ্যেই ভেঙে পড়েন তিনি। এর পরপরই আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে নিজের অবসরের ঘোষণা দিয়ে পুরো বিশ্বকে স্তব্ধ করে দেন। চোখের জল মুছতে মুছতেই সেদিন বলেছিলেন, দেশের হয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন তিনি, কিন্তু জাতীয় দলের হয়ে ট্রফি জেতা যেন তার ভাগ্যে নেই।
টানা ব্যর্থতা ও সমালোচনার সেই কালো অধ্যায়
২০১৬ সালের সেই বিদায়ের পেছনে জমে ছিল দীর্ঘদিনের মানসিক যন্ত্রণা ও ট্রফি না পাওয়ার আক্ষেপ। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনাল এবং ২০১৫ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালেও জার্মানি ও চিলির কাছে পরাজয়ের তিক্ততা সইতে হয়েছিল মেসিকে। টানা তিনটি বড় টুর্নামেন্টের ফাইনালে উঠেও রানার্স-আপ হয়ে মাঠ ছাড়তে হওয়ায় আর্জেন্টিনার একশ্রেণির সমর্থক ও গণমাধ্যম তার দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছিল। সমালোচনা আর তীব্র মনকষ্টের সেই সময়টাতে মানসিকভাবে ভীষণ একাকী হয়ে পড়েছিলেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। মেটলাইফের ফাইনালে হারের পর অবসরের সিদ্ধান্ত ছিল মূলত সেই পুঞ্জীভূত কষ্টের আকস্মিক বহিঃপ্রকাশ।
তবে সেই বিদায় চিরস্থায়ী রূপ নেয়নি। ফুটবল বিধাতা হয়তো মেসির জন্য ভিন্ন কোনো চিত্রনাট্য লিখে রেখেছিলেন। কয়েক মাস পরই দেশের আপামর মানুষের ভালোবাসা, সতীর্থদের আকুল আহ্বান এবং নিজের ভেতর লুকিয়ে থাকা অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে অবসরের সিদ্ধান্ত বদলে নীল-সাদা জার্সিতে ফিরে আসেন মেসি। এরপরের গল্পটা কেবলই রাজকীয় প্রত্যাবর্তনের। ২০২১ সালে ব্রাজিলের মাটিতে দীর্ঘ ২৮ বছরের শিরোপাখরা কাটিয়ে আর্জেন্টিনাকে এনে দেন কোপা আমেরিকার ট্রফি। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। ফিনালিসিমা জয় এবং ২০২২ সালে কাতারের মাটিতে অধরা বিশ্বকাপ উঁচিয়ে ধরে দেশের ফুটবলের ইতিহাসে নিজেকে সবচেয়ে সফল ও মহানায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন তিনি।
মেটলাইফ: বেদনা ও অর্জনের এক মেলবন্ধন
মেটলাইফ স্টেডিয়াম শুধু মেসির বেদনার স্মৃতিই বহন করে না, এই মাঠের সাথে জড়িয়ে আছে তার কিছু দুর্দান্ত অর্জনের গল্পও। ২০১২ সালে এই মাঠেই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলের বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচে দুর্দান্ত হ্যাটট্রিক করেছিলেন তিনি। সেই শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচে ৪–৩ গোলে জিতেছিল আর্জেন্টিনা, যার তিনটি গোলই এসেছিল মেসির পা থেকে। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে মেটলাইফের মাঠে এখন পর্যন্ত পাঁচটি ম্যাচ খেলে চারটি গোল করার কৃতিত্ব দেখিয়েছেন এলএমটেন। ফলে এই স্টেডিয়াম তার কাছে যেমন কষ্টের চোরাবালি, তেমনি বড় সাফল্যের এক অনন্য স্মারক।
ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি ট্রফি ও ব্যক্তিগত রেকর্ডের মালিক মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার এখন একদম শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। বয়সের বেড়াজালে বন্দি মেসির অবসরের বিষয়ে এখনও আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা না এলেও, আর্জেন্টিনার জার্সিতে তার প্রতিটি ম্যাচই এখন ভক্তদের কাছে এক একটি আবেগঘন উৎসব। বিশেষ করে মেটলাইফের মতো স্মৃতিবিজড়িত মাঠে তাকে আবারও চোখের জল ফেলতে দেখে ফুটবলপ্রেমীদের মনে অনায়াসেই ফিরে এসেছে এক দশক আগের সেই দৃশ্যপট। তবে সময়ের সাথে সাথে ছবির প্রেক্ষাপট বদলে গেছে পুরোপুরি। একসময় যে মেসি নিজেকে ব্যর্থ মনে করে বিষণ্ণ মনে বিদায় নিয়েছিলেন, আজ সেই তিনিই বিশ্বজয়ী ও লাতিন আমেরিকার রাজা। তাই মেটলাইফে আবারও তার চোখ ভিজলেও, এবার সেই অশ্রুর পাশে সগর্বে দাঁড়িয়ে আছে এক পূর্ণতার মহাকাব্য।