
মেসিকে নিয়ে স্কালোনি, ‘তার রেখে যাওয়া কিছুর বিকল্প নেই’
আর্জেন্টিনার জার্সিতে লিওনেল মেসির দীর্ঘ আন্তর্জাতিক অধ্যায়ের শেষ মুহূর্ত যত ঘনিয়ে আসছে, ততই আবেগী হয়ে উঠছে পুরো ফুটবলবিশ্ব। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে জাতীয় দলের হয়ে অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত উপহার দেওয়া এই মহাতারকার বিদায়ী ম্যাচকে ঘিরে এরই মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে আর্জেন্টিনায়। কোচ লিওনেল স্কালোনির কথাতেও ফুটে উঠেছে সেই আবেগ।
৬ অক্টোবর বুয়েনস আইরেসের ঐতিহাসিক এস্তাদিও মনুমেন্টালে বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচে শেষবারের মতো আর্জেন্টিনার হয়ে মাঠে নামার কথা মেসির। ৮৫ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার এই স্টেডিয়ামে ম্যাচটি দেখতে সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক উন্মাদনা তৈরি হয়েছে। মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ের সাক্ষী হতে মুখিয়ে আছেন আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা।
বুরকিনা ফাসোর বিপক্ষে ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে মেসির বিদায়ী ম্যাচ প্রসঙ্গে কথা বলেন স্কালোনি। টিকিটের বিপুল চাহিদার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, পাঁচটি মনুমেন্টাল স্টেডিয়াম থাকলেও সেগুলো পূর্ণ হয়ে যেত। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তিনি এ ম্যাচ নিয়ে অসংখ্য বার্তা পেয়েছেন বলেও জানান আর্জেন্টাইন কোচ।
স্কালোনির কাছে মেসির বিদায় শুধু একজন খেলোয়াড়ের শেষ ম্যাচ নয়, বরং একটি ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সমাপ্তি। তিনি মনে করেন, মেসি নিজেও সেই মুহূর্তে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়বেন। মনুমেন্টালের মাঠে মেসির শেষবার পা রাখার দৃশ্য সবার জন্যই স্মরণীয় হয়ে থাকবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
‘সবাই আবেগপ্রবণ থাকবে। মেসিও থাকবে। সে যেদিন মনুমেন্টালের মাঠে পা রাখবে, সেদিনটি সবার জন্য অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তার এই দিনের অংশ হতে পেরে আমি কৃতজ্ঞ’—বলেন স্কালোনি।
বিদায়ের আগে মেসির সঙ্গে দলের আরও দুটি অনুশীলন সেশন রয়েছে। এই অল্প সময়টুকু নিয়েই এখন ভাবছেন স্কালোনি। তাঁর মতে, শেষ মুহূর্তগুলোকে ফলাফল কিংবা অন্য কোনো চাপের চেয়ে বেশি করে উপভোগ করাই গুরুত্বপূর্ণ।
২০০৫ সালে আর্জেন্টিনার জাতীয় দলে অভিষেকের পর মেসি এখন পর্যন্ত খেলেছেন ২০৭টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ। এই সময়ে তাঁর নামের পাশে রয়েছে রেকর্ড ১২৫ গোল। জাতীয় দলের হয়ে ব্যক্তিগত সাফল্যের পাশাপাশি দলীয় অর্জনেও তিনি নিজেকে অমর করে রেখেছেন।
মেসির নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা ২০২১ ও ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা জিতেছে। ২০২২ সালে জিতেছে ফিনালিসিমা। একই বছর কাতার বিশ্বকাপে দীর্ঘ ৩৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় আর্জেন্টিনা। এসব সাফল্যের প্রতিটিতেই মেসির অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচটি হলে আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির আন্তর্জাতিক ম্যাচের সংখ্যা দাঁড়াবে ২০৮-এ। তবে পরিসংখ্যানের বাইরেও জাতীয় দলের জন্য মেসির অবদানকে বড় করে দেখছেন স্কালোনি। তাঁর মতে, মেসির সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার শুধু গোল, ট্রফি কিংবা ব্যক্তিগত রেকর্ড নয়; বরং দলের জন্য সবসময় নিজেকে প্রস্তুত রাখার মানসিকতা।
স্কালোনি বলেন, মেসির লিগ্যাসির অন্যতম বড় দিক হলো সবসময় দলের পাশে থাকার অদম্য ইচ্ছা। তিনি সবার আগে অনুশীলনে আসতেন এবং সবার শেষে বের হতেন। নিজের শরীরের যত্ন নেওয়া থেকে শুরু করে প্রতিটি ম্যাচের জন্য প্রস্তুতি—সবকিছুর মধ্যেই ছিল তাঁর অসাধারণ পেশাদারিত্ব।
এসব বিষয় অনেক সময় দর্শকদের চোখে পড়ে না। কিন্তু সতীর্থরা খুব কাছ থেকে মেসির এই পরিশ্রম দেখেছেন। স্কালোনির মতে, একজন খেলোয়াড় কীভাবে নিজের সেরাটা দেওয়ার জন্য প্রতিদিন প্রস্তুতি নিতে পারেন, মেসি তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ।
এই কারণেই মেসির রেখে যাওয়া উত্তরাধিকারকে অন্য যেকোনো অর্জনের চেয়ে আলাদা মনে করেন স্কালোনি। তাঁর ভাষায়, মেসি এমন কিছু রেখে যাচ্ছেন, যার কোনো বিকল্প নেই।
ম্যারাডোনার পর আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সিকে নিজের পরিচয়ের সঙ্গে একাকার করে নিয়েছেন মেসি। তাঁর পায়ে এই জার্সি পেয়েছে অসংখ্য রেকর্ড, শিরোপা ও স্মরণীয় মুহূর্ত। এবার জাতীয় দলের হয়ে সেই দীর্ঘ যাত্রার শেষ অধ্যায়ও লেখা হতে যাচ্ছে আর্জেন্টিনার মাটিতেই।
মনুমেন্টালের গ্যালারিতে হাজারো সমর্থকের সামনে মেসির শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ তাই নিছক একটি ফুটবল ম্যাচের চেয়ে অনেক বেশি কিছু। এটি হবে আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম উজ্জ্বল অধ্যায়ের আবেগঘন বিদায়।