বিশ্ব ফুটবলের দুই ধ্রুবতারা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ও লুকা মদ্রিচ। দীর্ঘ দুই দশক ধরে যারা ফুটবল বিশ্বকে বুঁদ করে রেখেছেন নিজেদের জাদুতে, ক্যারিয়ারের গোধূলিলগ্নে এসে তারা দাঁড়িয়ে আছেন এক অদ্ভুত মোহনায়। ৩৯ বছর বয়সী রোনালদো এবং ৪০ ছুঁইছুঁই মদ্রিচের সামনে এখন ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের অগ্নিপরীক্ষা। শেষ ৩২-এর এই বাঁচা-মরার লড়াইয়ে মুখোমুখি হচ্ছে পর্তুগাল ও ক্রোয়েশিয়া। বাংলাদেশ সময় শুক্রবার ভোর ৫টায় শুরু হতে যাওয়া এই মহারণ রূপ নিয়েছে এক আবেগঘন আবহে। নকআউটের নির্মম সমীকরণ বলছে, এই ম্যাচে যে দল হারবে, তাদের বিশ্বকাপ যাত্রা সেখানেই থমকে যাবে। ফলে ফুটবলপ্রেমীদের মনে একটাই প্রশ্ন—আজকের ম্যাচটিই কি এই দুই কিংবদন্তির যেকোনো একজনের জন্য বিশ্বমঞ্চে শেষ অভিযান বা ‘লাস্ট ড্যান্স’ হতে যাচ্ছে?
পর্তুগালের কোচ রবের্তো মার্তিনেজ অবশ্য এখনই এমন আবেগাক্রান্ত ভাবনায় ডুবে যেতে রাজি নন। ম্যাচ-পূর্ব সংবাদ সম্মেলনে রোনালদোর বিদায়ের প্রসঙ্গ উঠতেই বেশ জোর দিয়ে তিনি জানান, সিআরসেভেনের বিশ্বকাপ যাত্রা এখনই শেষ হচ্ছে না। মার্তিনেজের বিশ্বাস, রোনালদো আরও পথ পাড়ি দেবেন এবং এই ম্যাচটি কোনোভাবেই তার শেষ অধ্যায়ের শুরু নয়।
চলতি বিশ্বকাপে পর্তুগালের পথচলাটা খুব একটা মসৃণ ছিল না। গ্রুপ ‘কে’ থেকে রানার্সআপ হয়ে নকআউট পর্বের টিকিট কেটেছে তারা। গ্রুপ পর্বে ডিআর কঙ্গো ও কলম্বিয়ার সাথে ড্র করার পর, উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ৫-০ গোলের বড় জয় দিয়ে তারা শেষ ৩২ নিশ্চিত করে। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে মাঠে নামলেই বিশ্বকাপের ইতিহাসে নিজের ২৫তম ম্যাচ খেলার মাইলফলক স্পর্শ করবেন ৩৯ বছর বয়সি ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। তবে এই কীর্তির পাশাপাশি তার সামনে রয়েছে একটি পুরোনো বৃত্ত ভাঙার বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে এর আগে খেলা আটটি ম্যাচে কোনো গোল পাননি পর্তুগিজ যুবরাজ। খরা কাটানোর এর চেয়ে বড় মঞ্চ আর কী হতে পারে!
অন্য প্রান্তে থাকা লুকা মদ্রিচের গল্পটাও প্রায় এক। রিয়াল মাদ্রিদের জার্সিতে দীর্ঘ সময় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মাঠ কাঁপানো এই দুই সাবেক সতীর্থ এবার একে অপরকে বিদায় করার লড়াইয়ে নামছেন। ৪০ বছর বয়সেও ক্রোয়েশিয়ার মাঝমাঠের মূল চালিকাশক্তি মদ্রিচ। দুই বুড়ো তারকার এই লড়াই নিয়ে মার্তিনেজ বলেন, তারা দুজনেই সাধারণ মানুষের সমালোচনা কিংবা জনমতের অনেক ঊর্ধ্বে চলে গেছেন। এত দীর্ঘ সময় ধরে ফুটবলের সর্বোচ্চ স্তরে নিজেদের টিকিয়ে রাখাই প্রমাণ করে তারা কতটা অনন্য।
বয়স নিয়ে যারা প্রশ্ন তোলেন, তাদের উদ্দেশ্যে পর্তুগাল কোচ স্পষ্ট করে বলেন, বয়স আসলে সংখ্যার চেয়ে বেশি কিছু নয়। আসল দেখার বিষয় হলো, মাঠে নেমে তারা এখনো কতটা অবদান রাখছেন এবং ড্রেসিংরুমে তরুণ খেলোয়াড়দের কীভাবে অনুপ্রাণিত করছেন। মার্তিনেজের মতে, তারা দুজনেই বিশ্ব ফুটবলের জীবন্ত আইকন এবং তিনি আশা করেন, এখনই রোনালদোর ‘লাস্ট ড্যান্স’ দেখার সময় আসেনি।
গ্রুপ পর্বে পর্তুগাল তাদের চেনা ছন্দে না থাকলেও নকআউট পর্বের আগে দলের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখছেন কোচ। কলম্বিয়ার বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও যেভাবে দল ঘুরে দাঁড়িয়েছিল, সেই মানসিক শক্তিই এখন নকআউটের মূল জ্বালানি। মার্তিনেজের ভাষায়, আসল বিশ্বকাপ তো শুরু হচ্ছে এখন থেকেই। দুই যুগের দুই মহানায়কের এই দ্বৈরথে একজন এগিয়ে যাবেন নতুন স্বপ্ন বুকে নিয়ে, আর অন্যজনকে হয়তো চিরতরে বিদায় জানাতে হবে বিশ্বকাপের সবুজ গালিচাকে।
