
সাফ শুরুর আগেই দুশ্চিন্তায় বাংলাদেশ, মিলছে না প্রবাসী তারকারা
আট বছর পর দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ আয়োজন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। দেশের মাটিতে এই প্রতিযোগিতাকে ঘিরে ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি হলেও টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই বড় এক সমস্যার মুখে পড়েছে জাতীয় দল। ফিফার আন্তর্জাতিক বিরতির সূচির সঙ্গে সাফের শুরুর সময়ের ব্যবধানের কারণে প্রথম ম্যাচে অধিকাংশ প্রবাসী ফুটবলারকে পাচ্ছে না বাংলাদেশ। এতে টুর্নামেন্টের শুরুতেই দলটির শক্তিমত্তা ও প্রস্তুতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
আগামী ৪ নভেম্বর সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের পর্দা উঠবে। বাংলাদেশের প্রথম ম্যাচ ৫ নভেম্বর, প্রতিপক্ষ ভুটান। কিন্তু ফিফার আনুষ্ঠানিক আন্তর্জাতিক উইন্ডো শুরু হবে ৯ নভেম্বর থেকে। ফলে ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশের ক্লাবে খেলা বাংলাদেশি ফুটবলারদের শুরু থেকেই জাতীয় দলের সঙ্গে যোগ দেওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে। আন্তর্জাতিক উইন্ডোর বাইরে ক্লাবগুলো সাধারণত জাতীয় দলের হয়ে খেলতে ফুটবলারদের ছাড়তে বাধ্য থাকে না। এ কারণেই প্রথম ম্যাচের আগে পূর্ণ শক্তির দল গঠন করতে পারছে না বাংলাদেশ।
ইংলিশ ক্লাব শেফিল্ড ইউনাইটেডের হয়ে খেলা হামজা চৌধুরীর ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখা দিয়েছে। তাঁর ক্লাবের ম্যাচ রয়েছে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত। ফলে সাফের প্রথম ম্যাচের আগে তাঁকে পাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। শুধু হামজা নন, বিদেশি ক্লাবে খেলা অন্য বাংলাদেশি ফুটবলারদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সূচিগত জটিলতা রয়েছে।
বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সভাপতি তাবিথ আউয়াল জাতীয় দল কমিটির বৈঠক শেষে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি জানান, সাফের উদ্বোধনী পর্বে পূর্ণাঙ্গ স্কোয়াড পাওয়া সম্ভব হবে না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ৯০ শতাংশ প্রবাসী ফুটবলারকে ৯ নভেম্বরের পর পাওয়া যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে প্রথম ম্যাচের পর দলটির খেলোয়াড় সমন্বয়ে পরিবর্তন আনতে হতে পারে।
তাবিথ আউয়াল বলেন, সাফের উদ্বোধনী ম্যাচের জন্য পূর্ণ স্কোয়াড পাওয়া যাবে না। অধিকাংশ প্রবাসী ফুটবলার পরে যোগ দেওয়ায় প্রথম ম্যাচের পর ভিন্ন দল নিয়ে খেলতে হতে পারে। তিনি আরও জানান, আগামী ২৫ অক্টোবর থেকে জাতীয় দলের ক্যাম্প শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
Table of Contents
প্রস্তুতি ম্যাচ আয়োজনের পরিকল্পনা
সাফের আগে দলের প্রস্তুতি আরও ভালো করতে একটি প্রীতি ম্যাচ আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছে বাফুফে। তবে ম্যাচটি ফিফার আনুষ্ঠানিক আন্তর্জাতিক উইন্ডোর বাইরে অনুষ্ঠিত হবে। এ কারণে প্রতিপক্ষ নির্বাচন এবং প্রয়োজনীয় খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বাফুফে সভাপতি জানিয়েছেন, বিদেশ থেকে কোনো দলকে এনে ম্যাচ আয়োজনের চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি কোনো ক্লাবের সঙ্গে আলোচনা করেও প্রস্তুতি ম্যাচ চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এই ম্যাচের মাধ্যমে দলের কৌশল, খেলোয়াড়দের পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং মাঠের সমন্বয় যাচাই করার সুযোগ পেতে পারে কোচিং স্টাফ।
তবে আন্তর্জাতিক উইন্ডোর বাইরে ম্যাচ আয়োজন করলে প্রবাসী খেলোয়াড়দের সবাইকে পাওয়া যাবে কি না, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে। সাফের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতার আগে সীমিত সময়ের মধ্যে দলকে প্রস্তুত করা কোচিং স্টাফের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মাঠের মান নিয়েও উদ্বিগ্ন বাফুফে
জাতীয় দলের প্রস্তুতির ক্ষেত্রে খেলোয়াড়দের প্রাপ্যতার পাশাপাশি ঘরোয়া লিগের মাঠের অবস্থাও ভাবিয়ে তুলছে ফেডারেশনকে। অনুশীলন ও প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচের জন্য উপযুক্ত মাঠ না থাকলে খেলোয়াড়দের চোটে পড়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই মাঠের মান উন্নয়ন এবং ফুটবলারদের নিরাপত্তার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাফুফে সভাপতি।
দীর্ঘ প্রতিযোগিতার আগে খেলোয়াড়দের শারীরিক সক্ষমতা ধরে রাখা এবং চোটের ঝুঁকি কমানো অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে প্রবাসী ও স্থানীয় ফুটবলারদের একসঙ্গে অনুশীলনের সুযোগ সীমিত হলে দলের সমন্বয় গড়ে তোলার কাজ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। সে কারণে ক্যাম্প, প্রস্তুতি ম্যাচ এবং খেলোয়াড়দের ব্যবস্থাপনা—সবকিছুই পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
আসিয়ানে বড় হারের পর কোচকে ঘিরে প্রশ্ন
সাম্প্রতিক আসিয়ানের প্রতিযোগিতায় ইন্দোনেশিয়ার কাছে ৯ গোল হজম করেছিল বাংলাদেশ। বড় ব্যবধানের এই হার জাতীয় দলের পারফরম্যান্স নিয়ে সমালোচনা বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে প্রধান কোচ টমাস ডুলির দায়িত্ব ও ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
কোচের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তাবিথ আউয়াল জানান, ফুটবলে খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফ পরিবর্তন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তবে এ বক্তব্যের অর্থ এই নয় যে এখনই কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দলের প্রয়োজন বিবেচনায় যেকোনো সময় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
আসিয়ানে দলের পারফরম্যান্স পর্যালোচনার ক্ষেত্রে প্রতিটি বিভাগকে জবাবদিহির আওতায় আনা হয়েছে বলেও জানান বাফুফে সভাপতি। তাঁর মতে, তিনি নিজেও সংশ্লিষ্ট কমিটির কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য। খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সের ক্ষেত্রেও আরও বেশি দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সাফে ভালো শুরুর জন্য বড় পরীক্ষা
ঘরের মাঠে সাফ আয়োজন বাংলাদেশের জন্য নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। কিন্তু প্রথম ম্যাচেই প্রবাসী ফুটবলারদের অনুপস্থিতি দল গঠনের পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে প্রতিযোগিতার শুরুতে পয়েন্ট হারালে পরবর্তী ম্যাচগুলোতে চাপ বাড়ার আশঙ্কা থাকবে।
এ অবস্থায় স্থানীয় ফুটবলারদের প্রস্তুতি, সঠিক কৌশল নির্ধারণ এবং সীমিত সময়ের মধ্যে দলীয় সমন্বয় গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে কোচিং স্টাফকে। একই সঙ্গে প্রবাসী খেলোয়াড়েরা যোগ দেওয়ার পর তাঁদের দ্রুত দলের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থাও প্রয়োজন হবে।
সাফের আগে প্রস্তুতি ম্যাচ আয়োজন, খেলোয়াড়দের চোটমুক্ত রাখা এবং সাম্প্রতিক ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেওয়া—এই তিনটি বিষয় বাংলাদেশের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ঘরের মাঠে প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে সূচিগত জটিলতা সামলে প্রতিযোগিতার শুরু থেকেই কার্যকর ফুটবল উপহার দেওয়াই হবে জাতীয় দলের প্রধান চ্যালেঞ্জ।