
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে রেকর্ড ১৩ মুসলিম দেশ
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ফিফা পুরুষ বিশ্বকাপ আসরটি শুরু হয়েছে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ৩২ দলের চেনা গণ্ডি পেরিয়ে মোট ৪৮টি দেশের অংশগ্রহণে আয়োজিত এই মেগা আসরটি ফুটবল বিশ্বে একটি যুগান্তকারী মাইলফলক এবং এক নতুন যুগের বার্তা হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। এবারের আসরে ফুটবলপ্রেমীরা এক অনন্য রেকর্ডের সাক্ষী হচ্ছেন, কারণ বিশ্বমঞ্চের এই সর্ববৃহৎ ও বর্ধিত ফরম্যাটের আসরে ইতিহাসের সর্বোচ্চ রেকর্ডসংখ্যক ১৩টি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ একসঙ্গে মূল পর্বে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার যোগ্যতা অর্জন করেছে।
উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে মধ্য এশিয়া এবং ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তৃত ভৌগোলিক অঞ্চলের এই মুসলিম দেশগুলোর ব্যাপক উপস্থিতি বিশ্ব ফুটবলে মুসলিম বিশ্বের ক্রমবর্ধমান শক্তি, আধুনিক পরিকাঠামো এবং উচ্চ প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক অবস্থানের বাস্তব প্রতিফলন ঘটাচ্ছে। এটি টুর্নামেন্টের ইতিহাসে অন্যতম বৈচিত্র্যময় লাইন-আপ হিসেবে এক নতুন ইতিহাস তৈরি করেছে।
Table of Contents
আফ্রিকা মহাদেশের পরাশক্তিদের অবস্থান
আফ্রিকা মহাদেশের মুসলিম দেশগুলো বিগত কয়েক বছর ধরে বিশ্ব ফুটবলে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে। এবারের আসরেও তাদের উপস্থিতি এবং পূর্বের রেকর্ড বেশ আশাব্যঞ্জক।
মরক্কো
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে প্রথম আফ্রিকান ও আরব দেশ হিসেবে সেমিফাইনালে খেলার গৌরবময় ইতিহাস গড়েছিল ‘অ্যাটলাস লায়ন্স’ খ্যাত মরক্কো। এবারও তারা সবচেয়ে ফেবারিট মুসলিম দল হিসেবে মাঠে নামবে।
অধিনায়কত্ব: পিএসজির তারকা ফুলব্যাক আশরাফ হাকিমি।
অداشت অর্জন: ২০১৫ সালের ফিফা আরব কাপ জয় এবং সর্বশেষ আফ্রিকান নেশনস কাপে রানার্সআপ।
অভিজ্ঞতা: সর্বমোট সাতবার বিশ্বকাপ খেলার অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ মরক্কো বর্তমান ফুটবল বিশ্বে যেকোনো টুর্নামেন্টের অন্যতম প্রধান দাবিদার।
সেনেগাল
আফ্রিকার ফুটবলে সেনেগাল অন্যতম শীর্ষ শক্তি। মাঠের খেলায় সেনেগাল ২০২২ ও ২০২৬ সালের আফ্রিকা কাপ অব নেশনস ট্রফি জয় করলেও পরবর্তী সময়ে নিয়মভঙ্গ ও ম্যাচ পরিত্যাগের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে কনফেডারেশন অব আফ্রিকান ফুটবল (কাফ) তাদের শিরোপা কেড়ে নেয় এবং আনুষ্ঠানিকভাবে মরক্কোকে নতুন আফ্রিকান চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করে।
দলটির সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক সাফল্য এসেছিল ২০০২ সালের বিশ্বকাপে, যখন তারা তৎকালীন ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে পরাজিত করে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিল। বর্তমানে সৌদি আরবের পেশাদার লিগে খেলা তারকা ফুটবলার সাদিও মানে এই দলের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
আলজেরিয়া, মিসর ও তিউনিসিয়া
আলজেরিয়া: ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপের পর এই প্রথম ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে নিজেদের স্থান পুনরুদ্ধার করল আলজেরিয়া। ওই আসরে তারা শেষ ১৬ বা নকআউট পর্বে উন্নীত হয়ে তৎকালীন চ্যাম্পিয়ন জার্মানিকে অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে টেনে নিয়েছিল। ২০১৯ সালে আলজেরিয়াকে আফ্রিকা কাপ অব নেশনস শিরোপা জেতানো তারকা খেলোয়াড় রিয়াদ মাহরেজ এখনো দলটির অন্যতম সেরা ও নির্ভরযোগ্য স্তম্ভ।
সালাহ’র মিসর: ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে যোগ্যতা অর্জন করতে ব্যর্থ হওয়া লিভারপুলের বিশ্বখ্যাত তারকা মোহাম্মদ সালাহর মিসর এবার দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে ফিরে এসেছে। রেকর্ড সাতবারের আফ্রিকা কাপ অব নেশনস জয়ী এই ঐতিহ্যবাহী দলটি এবার তাদের ফুটবল ইতিহাসের চতুর্থ বিশ্বকাপ খেলবে।
তিউনিসিয়া: আফ্রিকা মহাদেশের অন্যতম শক্তিশালী দল তিউনিসিয়ার জন্য এটি সর্বমোট সপ্তম বিশ্বকাপ আসর। গত কাতার বিশ্বকাপে তৎকালীন ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে ১-০ গোলের ব্যবধানে পরাজিত করে বিশ্বকে চমকে দেওয়া এই দলটি এবার গ্রুপ পর্বের কঠিন বাধা টপকে প্রথমবারের মতো নকআউট পর্বে যাওয়ার নতুন ইতিহাস গড়তে বদ্ধপরিকর।
মধ্যপ্রাচ্য ও আরব অঞ্চলের প্রতিদ্বন্দ্বীদের চালচিত্র
| দেশ | বিশ্বকাপ অংশগ্রহণের সংখ্যা | উল্লেখযোগ্য তথ্য ও অর্জন |
| কাতার | ২য় বার | কাতার কাতার বিশ্বকাপে আয়োজক হিসেবে সরাসরি খেললেও, এবারই প্রথম তারা মূল বাছাইপর্বের কঠিন বৈতরণী সফলভাবে পার হয়ে নিজস্ব যোগ্যতায় বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়েছে। টানা দুবার এশিয়ান কাপ জেতা দলটির প্রাণভোমরা হলেন এশিয়ার বর্ষসেরা ফুটবলার আকরাম আফিফ এবং অলটাইম টপ স্কোরার আলমোয়েজ আলী। |
| সৌদি আরব | ৭ম আসর | ১৯৯৪ সালে নিজেদের অভিষেক বিশ্বকাপে নকআউট পর্বে পৌঁছানো এবং ২০২২ সালের বিশ্বকাপে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে ২-১ গোলের ব্যবধানে পরাজিত করার ঐতিহাসিক স্মৃতি রয়েছে। ২০৩৪ সালের ফিফা বিশ্বকাপের একক আয়োজক দেশ হিসেবে সৌদি আরব বর্তমানে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগের মাধ্যমে বৈশ্বিক ফুটবলে নিজেদের প্রভাব ক্রমাগত বিস্তার করে চলেছে। |
| ইরাক | ২য় আসর | ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপের পর এই প্রথম দীর্ঘ চার দশক পর বিশ্বমঞ্চে ফিরল ইরাক। দীর্ঘ আড়াই বছর ধরে মোট ২১টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে আধুনিক ফুটবলের অন্যতম দীর্ঘতম ও কঠিনতম বাছাইপর্বের মিশন পার করে তবেই তারা আমেরিকার টিকিট নিশ্চিত করেছে। ২০০৭ সালের এশিয়ান কাপ জয়ী ইরাক এবার বিশ্বকাপে নিজেদের ইতিহাসের প্রথম জয় কিংবা ড্রয়ের সন্ধানে মরিয়া। |
| জর্ডান | ১ম আসর (অভিষেক) | ২০২৬ বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো ডেবিউ বা অভিষেক হতে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ জর্ডানের। ২০২৪ সালে প্রথমবার এশিয়ান কাপের ফাইনালে ওঠার গৌরব অর্জন করার পর এবার সরাসরি মূল বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করা জর্ডানের সামগ্রিক ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্জন। ইউরোপের শীর্ষ ৫ লিগে খেলা জর্ডানের প্রথম ফুটবলার মুসা আল-তামারি এই দলের মূল চালিকাশক্তি। |
এশিয়া ও ইউরোপের অন্যান্য মুসলিম দেশের অবস্থান
ইরান
এটি ইরানের ফুটবল ইতিহাসে টানা চতুর্থ এবং সর্বমোট সপ্তম বিশ্বকাপ আসর। এশিয়ার অন্যতম সেরা ফরোয়ার্ড মেহেদি তারেমির নেতৃত্বাধীন এই অভিজ্ঞ দলে আরও আছেন আলিরেজা জাহানবখশ এবং এহসান হাজসাফির মতো তারকা খেলোয়াড়রা। তবে এবারের বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা ইরানের জন্য সহজ ছিল না; কারণ বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার মাত্র চার মাস আগেও দেশটিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার মুখোমুখি হতে হয়েছে, যা তাদের সামগ্রিক ঘরোয়া ফুটবল ব্যবস্থাপনাকে মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল।
তুরস্ক
দীর্ঘ দুই দশকের দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর পুনরায় বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে ফিরে এসেছে ইউরোপের দেশ তুরস্ক। ২০০২ সালের বিশ্বকাপে তৃতীয় স্থান অধিকার করে বিশ্ব ফুটবলকে চমকে দেওয়া দলটি এবার ইতালীয় কোচ ভিনসেনজো মন্তেল্লার যোগ্য অধীনে ইউরোপীয় প্লে-অফের কঠিন ধাপ পেরিয়ে মূল পর্বে এসেছে। আক্রমণভাগে কেরেম আকতুরকোলোর মতো তরুণ প্রতিভাদের ওপর ভর করে তারা হাকান সুকুর ও রুস্তু রেচবারদের সেই ঐতিহাসিক সোনালি সাফল্যের পুনরাবৃত্তি করতে চায়।
বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা
ইউরোপের বলকান অঞ্চলের এই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটি ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে, যার পূর্বে তারা প্রথমবার ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছিল। এবার প্লে-অফ শুটআউটে চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ইতালিকে নাটকীয় ও রুদ্ধশ্বাস ম্যাচে পরাজিত করে তারা আমেরিকার টিকিট নিশ্চিত করে বিশ্ব ফুটবলে বড় ধরনের চমক সৃষ্টি করেছে।
উজবেকিস্তানের নতুন ইতিহাস
জর্ডানের মতো মধ্য এশিয়ার দেশ উজবেকিস্তানও এবার বিশ্বকাপে প্রথম অভিষেক ঘটিয়ে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করতে যাচ্ছে। মধ্য এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে তারা বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। বিগত কয়েক দশক ধরে অত্যন্ত অল্পের জন্য সুযোগ হাতছাড়া হওয়া এই দলটির দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে ২০২৫ সালের কোয়ালিফায়ারে। দলের প্রধান তারকা ও অধিনায়ক এলডর শোমুরোদভ এবং তরুণ উদীয়মান ডিফেন্ডার আবদুকোদির খুসানভ এবার বিশ্বমঞ্চে দেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন।